বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। সংগৃহীত ছবি
মেলবোর্ন, ২৪ আগষ্ট- কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত বালিয়াড়ি ভরাট ও কেটে চার লেনের সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া এ ধরনের নির্মাণকাজ নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা। তাঁদের অভিযোগ, সড়ক নির্মাণের নামে সৈকতের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় উদ্ভিদ ধ্বংস করা হচ্ছে।
নগর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে গত বছরের ১৭ জুন সড়ক নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৮ মিটার প্রশস্ত সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কাজটি করছে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)।
কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়া বলেন, সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যবর্ধন, ভাঙনকবলিত এলাকা সুরক্ষা এবং পর্যটকদের সুবিধার জন্য সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
তবে পৌরসভার এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন পরিবেশবাদীরা।
বালিয়াড়ি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেয়াল
ক্লাইমেট জাস্টিস বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী জাবেদ নূর শান্ত বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বালিয়াড়ির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সেখানে সড়ক নির্মাণ হলে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আকর্ষণ নষ্ট হবে।
তিনি বলেন, বালিয়াড়ি শুধু বালুর স্তূপ নয়। ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত ঠেকানো, উপকূলীয় ক্ষয় কমানো এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় এটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেয়ালের কাজ করে। সাগরলতাসহ বিভিন্ন উপকূলীয় উদ্ভিদ বালু আটকে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে। সেই বালিয়াড়ি কেটে সড়ক নির্মাণ উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, সৈকতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ না করা এবং সেখানে থাকা স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৩ সালের মহাপরিকল্পনায় পৌরসভা এলাকার জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী রেখা থেকে সৈকতসংলগ্ন প্রথম ৩০০ মিটার এলাকা ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। তাই সড়ক নির্মাণের কাজ বন্ধ করা উচিত।
কক্সবাজারের আইনজীবী ইউসুফ আরমান বলেন, সৈকতে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণে সর্বোচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নির্মাণকাজ বন্ধ না হলে জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠানোর কথা জানান তিনি।
বালিয়াড়ি কেটে চলছে নির্মাণকাজ
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরোনো সড়কের পশ্চিম পাশে বিস্তীর্ণ এলাকায় বালু ফেলে জায়গা উঁচু ও সমতল করা হয়েছে। ভরাট করা অংশের ওপর দিয়েই নতুন সড়কের নির্মাণকাজ চলছে। কোথাও কোথাও সড়কের জায়গা তৈরির জন্য বালিয়াড়ি কেটে ফেলা হয়েছে। উপড়ে ফেলা হয়েছে সাগরলতার ঝোপও।
কক্সবাজারের পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে সমুদ্রসৈকতের ভাঙন প্রতিরোধ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একটি ডেইল তৈরি করা হয়েছিল। পাশে বিকল্প জায়গা থাকার পরও সড়ক নির্মাণ করতে সেই ডেইল ধ্বংস করা হচ্ছে। নির্মাণকাজ দ্রুত বন্ধ করা প্রয়োজন।
পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
সড়ক নির্মাণের পরিবেশ ছাড়পত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিইর প্রকল্প ব্যবস্থাপক শাহীন মিয়া বলেন, এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভা বলতে পারবে।
পৌরসভার সচিব রাসেল চৌধুরী বলেন, ‘এটি বিদেশি সংস্থার অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে। এখানে কারও অনুমোদনের দরকার নেই। এটি টেকনিক্যাল ইস্যু, এটি আমরা বুঝব।’
তবে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক জমির উদ্দিন জানান, সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণের স্থানটি অধিদপ্তরের একটি দল পরিদর্শন করেছে। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেন, সড়কটি মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হচ্ছে। শহর সুরক্ষা বাঁধ হিসেবেও এটি কাজ করবে এবং পৌরসভার তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ চলছে। এরপরও কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।