মেলবোর্ন, ২৪ আগষ্ট- রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়মকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার বেদনাময় কাহিনি নয়; এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও একটি বড় পরীক্ষা।
একই পরিবারের চারজনকে নিজ বাড়িতে হত্যা করা হলো। মরদেহগুলো পাওয়া গেল বাড়ির বিভিন্ন স্থানে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল, ঘরের আসবাব ও মূল্যবান জিনিস রাখার স্থান ভাঙচুর করা হয়েছিল এবং মূল ফটকে বাইরে থেকে তালা ঝুলছিল। নিহতদের মুখে দাহ্য পদার্থ ঢেলে পোড়ানোর আলামতের কথাও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে সিআইডি। এতগুলো অস্বাভাবিক ও ভয়াবহ উপাদান থাকা সত্ত্বেও ঘটনার পরপরই এটিকে ‘ডাকাতির ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। পরে আবার পুলিশ জানায়, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় দুই যুবক একে একে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করেছে। তদন্তের একেবারে শুরুতে ঘটনার ব্যাখ্যা এভাবে বদলে যাওয়া জনমনে সংশয় আরও বাড়িয়েছে।
দুই সন্দেহভাজন মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিই কোনো মামলার চূড়ান্ত সত্য নয়। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত, ডিজিটাল তথ্য এবং ঘটনাপরম্পরার মাধ্যমে সেই বক্তব্যের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ অতীতে বহুল আলোচিত অপরাধের তদন্তে সাজানো আসামি, চাপের মুখে দেওয়া স্বীকারোক্তি এবং বহুল উচ্চারিত ‘জজ মিয়া নাটক’ দেখেছে। তাই এই মামলায় মানুষের সন্দেহকে অবজ্ঞা না করে প্রমাণের মাধ্যমে দূর করতে হবে।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন
নিহতের স্বজনেরা বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দাবি ও বিরোধের অভিযোগ তুলেছেন। স্থানীয় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ এবং হত্যাকাণ্ডের দিন সহযোগীদের নিয়ে বাড়ির আশপাশে তাঁকে দেখার দাবিও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ সত্য কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক, সামাজিক বা প্রশাসনিক প্রভাব থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই যুবক পাশের ভবন দিয়ে ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিল। কিন্তু এই ব্যাখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।
তারা কীভাবে নিশ্চিত হয়েছিল যে বাড়ির ছাদে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করা যাবে?
বিদ্যুৎ সংযোগ কে এবং কখন বিচ্ছিন্ন করেছিল?
হত্যার পর বাড়ির ফটকে তালা লাগানো হলো কীভাবে?
ঘরের আসবাব ও মূল্যবান সামগ্রী রাখার স্থান কেন ভাঙা হয়েছিল?
চারটি মোবাইল ফোন কোথায় পাওয়া গেছে এবং সেগুলোর কল রেকর্ড ও অবস্থান কী বলছে?
নিহতদের মুখে দাহ্য পদার্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্য কী ছিল?
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশি বা গামছায় কার আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ পাওয়া গেছে?
সন্দেহভাজনদের মোবাইল লোকেশন, কললিস্ট এবং ঘটনাস্থলের ফরেনসিক আলামত কি পুলিশের বর্ণনাকে সমর্থন করছে?
এলাকায় থাকা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে কি?
বাড়ি নির্মাণকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির অভিযোগটি আলাদাভাবে তদন্ত করা হচ্ছে কি?
নিহত তরুণীর ওপর যৌন সহিংসতা হয়েছিল কি না—ময়নাতদন্তে তা পরীক্ষা করা হয়েছে কি?
এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে কেবল একটি স্বীকারোক্তিনির্ভর কাহিনি প্রচার করা হলে সন্দেহ দূর হবে না। বরং প্রকৃত অপরাধী বা নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী থেকে থাকলে তার আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
নিহতদের পরিচয় উপেক্ষা করার সুযোগ নেই
নিহত চারজনই সনাতন ধর্মাবলম্বী। তাই হত্যাকাণ্ডের পেছনে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, সংখ্যালঘু পরিবারকে ভয় দেখানো, সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ—প্রতিটি সম্ভাবনাই সমান গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। কোনো একটি উদ্দেশ্য প্রমাণিত হওয়ার আগে অন্য সম্ভাবনাগুলো বন্ধ করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তা কিংবা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তার ধর্মীয় পরিচয় তদন্তের নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা হতে পারে না। একইভাবে তাঁদের পরিচয় সামনে এনে সরকারের অবস্থানকে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের চেষ্টা করাও অনুচিত। কর্মকর্তা হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান—সেটি নয়; তাঁরা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপমুক্তভাবে কাজ করতে পারছেন কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কর্মকর্তাদের সামনে রেখে একটি প্রশ্নবিদ্ধ তদন্তকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা তাঁদের জন্যও অসম্মানজনক হবে।
সরকার কেন সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকবে?
এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ভয়াবহতা প্রকাশিত হলে দেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ক্ষোভ ও সরকারবিরোধী মনোভাব তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নানা টানাপোড়েনের মধ্যে একটি হিন্দু পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনা কূটনৈতিক অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে সরকার ঘটনাটি আড়াল করছে—এমন অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। কিন্তু তদন্তে অস্বচ্ছতা, তড়িঘড়ি ব্যাখ্যা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হলে সেই সন্দেহই শক্তিশালী হবে।
সরকারের দায়িত্ব সন্দেহ প্রকাশকারীদের দমন করা নয়; বরং এমন স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা, যাতে ধামাচাপার অভিযোগ দাঁড়াতেই না পারে। সত্য প্রকাশ সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হলেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব সত্যের পক্ষেই দাঁড়ানো।
প্রয়োজন স্বাধীন ও প্রমাণনির্ভর তদন্ত
এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে শুধু স্থানীয় পুলিশের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। অভিজ্ঞ অপরাধ তদন্তকারী, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় পর্যবেক্ষণের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদন্তপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রকাশ করতে হবে। সন্দেহভাজনদের স্বীকারোক্তির পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক আলামত, মোবাইল তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, আর্থিক লেনদেন এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ যাচাই করতে হবে।
নিহতের স্বজন, প্রতিবেশী ও সম্ভাব্য সাক্ষীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি। প্রভাবশালী কারও বিরুদ্ধে তথ্য থাকলে যাতে ভয় ছাড়াই তা তদন্তকারীদের জানানো যায়, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু দুজন তরুণকে গ্রেপ্তার করে মামলাটি দ্রুত শেষ করা নয়। ন্যায়বিচার মানে—কারা হত্যা করেছে, কেন করেছে, তাদের সহযোগী বা নির্দেশদাতা ছিল কি না এবং হত্যার পর ঘটনাটি অন্য খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হয়েছিল কি না—সবকিছুর পূর্ণাঙ্গ উত্তর বের করা।
একটি পরিবারের চারটি জীবন নির্মমভাবে নিভে গেছে। রাষ্ট্র যদি সত্যের বদলে সুবিধাজনক কোনো কাহিনিকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে সেটি হবে নিহতদের দ্বিতীয়বার হত্যা করার শামিল। তাই এই মুহূর্তে প্রয়োজন প্রচারনির্ভর সিদ্ধান্ত নয়—স্বাধীন তদন্ত, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং প্রশ্নহীন ন্যায়বিচার।
এই হত্যাকাণ্ডকে ‘ডাকাতি’ কিংবা ‘মাদকসেবনে বাধা দেওয়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া’ বলে দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। রংপুরের চার হত্যার প্রতিটি স্তর উন্মোচিত না হওয়া পর্যন্ত প্রশ্ন চলতেই থাকবে—কারণ ন্যায়বিচার শুধু হতে হয় না, তা যে হয়েছে, জনগণের কাছে সেটিও বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রমাণ করতে হয়।
-সম্পাদক: ড. প্রদীপ রায়, মেলবোর্ন