তিন সাংবাদিককে মারধরের পর বিএনপি নেতা বললেন, ‘তোমরা লেখবা, আমরা পিডামু’
মেলবোর্ন, ২৬ আগষ্ট- শরীয়তপুরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় তিন সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লার বিরুদ্ধে। এ ঘটনার বিষয়ে জানতে…
মেলবোর্ন, ২৬ আগষ্ট- ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় উচ্চ সতর্কতা জারি করতে বাধ্য করা বোমা হামলার হুমকির ই-মেইলগুলোর পেছনে থাকা ব্যক্তিকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে নতুন কিছু সূত্র সামনে এসেছে। দুটি হুমকির ই-মেইল বিশ্লেষণ করে লাটভিয়ার দুটি ই-মেইল ঠিকানা, বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত একটি স্বতন্ত্র ব্যবহারকারীর নাম এবং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মুদ্রায় লেনদেন করা একটি পি-টু-পি প্ল্যাটফর্মের অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে বলে নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রথম হুমকির ই-মেইল পাঠানোর দিনই ওই পি-টু-পি প্ল্যাটফর্মটি বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। পরে যেদিন অর্থ পরিশোধের দাবি করা হয়, সেই সপ্তাহেই প্ল্যাটফর্মটির লেনদেন সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
ঢাকার বোমা হামলার হুমকির ঘটনায় কয়েক দিন ধরে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) এবং গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ডিবি প্রকাশ্যে শুধু জানিয়েছে, হুমকিদাতারা একটি সম্ভাব্য ‘ভুয়া গোষ্ঠীর’ নাম ব্যবহার করে থাকতে পারে।
তবে হুমকির ই-মেইলে থাকা তথ্যগুলো তদন্তকারীদের জন্য আরও নির্দিষ্ট কিছু সূত্রের সন্ধান দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্রের শুরু লাটভিয়ার রিগায়
হুমকির দুটি ই-মেইল আলাদা দুটি ইনবক্স ডট এলভি ঠিকানা থেকে পাঠানো হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয়, দুটি ঠিকানাতেই ‘নুনস’ শব্দটি রয়েছে।
ইনবক্স ডট এলভি পরিচালনা করে লাটভিয়ার রিগাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এসআইএ ইনবক্সস। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা রিগার মাতরোজু ইলা এলাকায়।
প্রতিবেদনের জন্য ওই ই-মেইল সেবা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। এতে দেখা যায়, কিছু সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের প্রয়োজন হয়। ব্যাংক কার্ড, পেপ্যাল ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অঞ্চল, যন্ত্র বা অ্যাকাউন্টের ধরন অনুযায়ী সেবার নিয়ম ভিন্ন হতে পারে।
এ ছাড়া অ্যাকাউন্টগুলো বর্তমান বিধিনিষেধ চালুর আগেরও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বহির্গামী ই-মেইল পাঠানোর জন্য ফোন নম্বর যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়ে থাকতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইনবক্স ডট এলভি তাদের সেবায় আইপি ঠিকানা ও অন্যান্য কারিগরি তথ্য সংরক্ষণ করে বলে জানিয়েছে। অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ব্যবহৃত সেবার ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ফোন নম্বর ও পেপ্যাল অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্যও সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে তদন্তকারীরা চাইলে লাটভিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ওই দুটি অ্যাকাউন্টের নিবন্ধন ও লগইন সংক্রান্ত তথ্য, আইপি ঠিকানা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ফোন নম্বর বা অর্থ পরিশোধের তথ্য চেয়ে দেখতে পারেন।
লাটভিয়ার ঢাকায় স্থায়ী দূতাবাস নেই। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রিগা ও সংশ্লিষ্ট লাটভীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
একই ব্যবহারকারীর নাম ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মেও
তদন্তের দ্বিতীয় সূত্রটি আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। হুমকির ই-মেইলে যে নামটি ব্যবহার করা হয়েছে, একই ধরনের একটি নাম বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে ‘ডিসেন্টক্যাঙ্গারু৯০৬’ নামে একটি ব্যবহারকারীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যিনি নুনস নামের একটি পি-টু-পি ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিক্রির প্রস্তাব দিতেন।
পি-টু-পি লেনদেনের ক্ষেত্রে সাধারণত একজন ব্যক্তি সরাসরি আরেকজন ব্যক্তির সঙ্গে ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা করেন। প্ল্যাটফর্মটি লেনদেনের সময় ক্রিপ্টোকারেন্সি সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করে রাখে। ক্রেতা অর্থ পরিশোধ করার পর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নুনস প্ল্যাটফর্মে ৫০০টির বেশি অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক লেনদেনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের স্থানীয় মোবাইল আর্থিক সেবাও ছিল।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মুদ্রায় লেনদেনের তথ্য
‘ডিসেন্টক্যাঙ্গারু৯০৬’ নামের অ্যাকাউন্টটির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রস্তাবে বাংলাদেশি টাকা, পাকিস্তানি রুপি, নেপালি রুপি ও কেনিয়ান শিলিংসহ বিভিন্ন মুদ্রায় ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশি টাকার ক্ষেত্রে বিকাশ এবং পাকিস্তানি রুপির ক্ষেত্রে জ্যাজক্যাশের মাধ্যমে লেনদেনের প্রস্তাবও ওই অ্যাকাউন্টে ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই হুমকির ই-মেইলের সঙ্গে ওই অ্যাকাউন্টের একটি সম্ভাব্য যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে।
কারণ, ১৭ আগস্ট পাঠানো প্রথম ই-মেইলে ১০ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি দাবি করা হয়েছিল। পরে ১৯ আগস্ট পাঠানো স্মরণ করিয়ে দেওয়া ই-মেইলে দাবির পরিমাণ পরিবর্তন করে ১০ বিলিয়ন টাকা করা হয়।
অর্থাৎ হুমকির ই-মেইলে যে দুটি মুদ্রার কথা বলা হয়েছে, একই স্বতন্ত্র ব্যবহারকারীর নামে পরিচালিত একটি ক্রিপ্টো অ্যাকাউন্টেও সেই দুটি মুদ্রায় লেনদেনের প্রস্তাব পাওয়া গেছে।
তবে শুধু একই ব্যবহারকারীর নাম ও মুদ্রার উপস্থিতিই অ্যাকাউন্টটি হুমকিদাতার বলে প্রমাণ করে না। তদন্তে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের পরিচয় যাচাই, লগইন তথ্য, আইপি ঠিকানা এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করলেই প্রকৃত যোগসূত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
বিন্যান্স পে-তেও পাওয়া গেছে কাছাকাছি নাম
হুমকির ই-মেইলে ব্যবহৃত নামের সঙ্গে মিল রয়েছে এমন একটি পরিচয় বিন্যান্স পে-তেও পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সেখানে একই ধরনের একটি নাম পাওয়া যায়, যার বানানে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। মূল নামের একটি অক্ষরের পরিবর্তন ছাড়া দুটি নাম প্রায় একই।
তদন্তের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। কারণ একই ব্যক্তি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একই বা কাছাকাছি ব্যবহারকারীর নাম ব্যবহার করে থাকলে সেসব অ্যাকাউন্টের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে বের করা সম্ভব হতে পারে।
তবে একই ধরনের ব্যবহারকারীর নাম একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করতে পারেন। তাই কেবল নামের মিলের ভিত্তিতে কাউকে হুমকিদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না।
হুমকির দিনই বন্ধ হতে শুরু করে নুনস
পুরো ঘটনার সবচেয়ে রহস্যজনক দিক হিসেবে উঠে এসেছে নুনস প্ল্যাটফর্মটি বন্ধ হওয়ার সময়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ আগস্ট নুনস তাদের সেবা বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করে। ওই দিনই প্রথম বোমা হামলার হুমকির ই-মেইল পাঠানো হয়।
পরে ২১ আগস্ট নুনসের পি-টু-পি বাজার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সেখানে নতুন করে লেনদেন করা সম্ভব হয়নি এবং প্ল্যাটফর্মটি শুধু অর্থ উত্তোলনের পর্যায়ে চলে যায়।
অন্যদিকে ১৯ আগস্ট পাঠানো হুমকির ই-মেইলে বলা হয়েছিল, দাবি করা অর্থ ওই সপ্তাহের মধ্যেই পরিশোধ করতে হবে।
সময়গুলোর এই মিল তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যদি ‘ডিসেন্টক্যাঙ্গারু৯০৬’ অ্যাকাউন্টটির সঙ্গে হুমকিদাতার সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত হয়, তাহলে নুনস বন্ধ হওয়ার আগে শেষবারের মতো বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
তবে এটিকে এখনই অর্থ আদায়ের সাধারণ প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নাকি অর্থ আদায়ের চেষ্টা?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উগ্রবাদী সংগঠনগুলো যেমন বিভিন্ন ছদ্মনাম ও পি-টু-পি ক্রিপ্টো লেনদেনের পথ ব্যবহার করতে পারে, তেমনি সাধারণ প্রতারকরাও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে।
ফলে হুমকিগুলোর উদ্দেশ্য শুধু অর্থ আদায় ছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হুমকিদাতারা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত ই-মেইলের উৎস শনাক্ত করতে পারে, তাদের পরিচয় বের করতে পারে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে পারে, সেটি যাচাই করতেও এমন হুমকি দিয়ে থাকতে পারে।
তদন্তে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ
ঘটনার সূত্র যেহেতু লাটভিয়ার ই-মেইল সেবা থেকে শুরু হয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও আন্তর্জাতিক পি-টু-পি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত বিস্তৃত, তাই শুধু দেশীয় তদন্তে পুরো বিষয়টি উদঘাটন কঠিন হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ই-মেইল সেবা, ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম, অর্থ লেনদেনের মাধ্যম এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
এরই মধ্যে ২৩ আগস্ট ঢাকায় চীনা দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত আইজি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে পুলিশ-টু-পুলিশ সহযোগিতা, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ এবং কারিগরি সহায়তা বিনিময়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় পাঠানো বোমা হামলার হুমকির তদন্তে এখন তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমত, লাটভিয়ার ইনবক্স ডট এলভির দুটি অ্যাকাউন্টের কারিগরি তথ্য। দ্বিতীয়ত, ‘ডিসেন্টক্যাঙ্গারু৯০৬’ নামের ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাকাউন্ট এবং এর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানি মুদ্রায় লেনদেনের তথ্য। তৃতীয়ত, হুমকির দিনই নুনস প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হওয়ার সময়ের সঙ্গে ওই অ্যাকাউন্টের সম্ভাব্য সম্পর্ক।
এসব তথ্যের কোনোটিই এককভাবে হুমকিদাতার পরিচয় নিশ্চিত করে না। তবে আইপি ঠিকানা, নিবন্ধন তথ্য, অর্থ লেনদেনের নথি এবং অ্যাকাউন্ট যাচাইয়ের তথ্য হাতে এলে হুমকির উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au