শরীয়তপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৬ আগষ্ট- শরীয়তপুরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় তিন সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লার বিরুদ্ধে। এ ঘটনার বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে আরেক সাংবাদিককেও মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। ফোনালাপে ওই নেতা বলেন, ‘তোমরা লেখবা, আমরা পিডাইমু।’
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। হামলার শিকার সাংবাদিকরা হলেন দ্য ডেইলি স্টারের জেলা প্রতিনিধি জাহিদ হাসান, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও জাগো নিউজের প্রতিনিধি বিধান মজুমদার এবং মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি বরকত মোল্লা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সাংবাদিকদের ভাষ্য, শরীয়তপুরের বিএনপির একটি পক্ষ ‘শরীয়তপুর জেলার সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করছিল। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে সংবাদ সংগ্রহের জন্য যান ওই তিন সাংবাদিক। এ সময় আরিফুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে তাঁদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
হামলার কারণ জানতে মঙ্গলবার বিকেলে জাজিরা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সোনালী নিউজের শরীয়তপুর প্রতিনিধি পলাশ খান বিএনপি নেতা আরিফুজ্জামান মোল্লাকে ফোন করেন। এ সময় ওই নেতার সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের একটি রেকর্ড পাওয়া গেছে।
ফোনালাপে আরিফুজ্জামান মোল্লাকে বলতে শোনা যায়, ‘আরও তো মারুম, শুধু এহন না। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে পারে। অনেকেই লিস্টে আছে।’ পরে তিনি পলাশ খানকেও হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তুমি নিজেও তৈরি থাক। তুমি আছ কোথায় এখন? বসো, আসতেছি।’
একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা লেখবা, আমরা পিডাইমু।’ একই ফোনালাপে তিনি সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের নিয়েও বিভিন্ন মন্তব্য করেন।
পলাশ খান বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর তিন সহকর্মীকে মারধরের অভিযোগ ওঠার পর তিনি অভিযুক্ত বিএনপি নেতার বক্তব্য জানতে ফোন করেছিলেন। তখন তাঁকেও মারধরের হুমকি দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আমাকেসহ সহকর্মীদেরও মারধর করবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। বিষয়টি আমি মৌখিকভাবে পুলিশকে জানিয়েছি। লিখিতভাবে আইনি পদক্ষেপ নেব।’
এদিকে ঘটনার বিষয়ে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লার বক্তব্য জানতে মঙ্গলবার রাত আটটা পর্যন্ত একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া ও সদর সার্কেল) মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মিরাজ বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার তথ্য পুলিশ জানতে পেরেছে। তবে এখনো লিখিত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত শনিবার রাতে প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীরের তিনটি দেয়াল ভেঙে দেওয়া হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে সাংবাদিক বি এম ইসরাফিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন ও জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের ছবি দিয়ে প্রতিবাদ জানান।
এর জেরে তাঁর ওপর হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। হামলা এবং প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দেওয়ার প্রতিবাদে রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকেরা। কর্মসূচি থেকে জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ সাংবাদিকদের ওপর ক্ষুব্ধ হয় বলে স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার ‘শরীয়তপুর জেলার সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সেই কর্মসূচিতে জেলা পর্যায়ের বিএনপির নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচি চলাকালে সংবাদ সংগ্রহের জন্য সেখানে গেলে জাহিদ হাসান, বিধান মজুমদার ও বরকত মোল্লাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার পর সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং পরে আরেক সাংবাদিককে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।