মেলবোর্ন, ২৬ আগষ্ট- রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনা নতুন করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক মাস ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খুন, রাজনৈতিক সংঘাত, মব সহিংসতা ও পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২ হাজার ৭৬টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ সাত মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। শুধু মে থেকে জুলাই, এই তিন মাসেই খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৯৩৪টি।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০টি খুনের ঘটনা ঘটছে। তার ভাষায়, গড়ে প্রতিদিন ১০টি খুন যেন মানুষের ভাগ্যে লেখা হয়ে গেছে।
সাত মাসে দুই হাজারের বেশি খুনের মামলা
পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৮৭টি মামলা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৬ এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি মামলা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে জুন মাসে, ৩২৬টি। এরপর মার্চে ৩১৭ এবং মে মাসে ৩১০টি মামলা হয়েছে।
অর্থাৎ বছরের প্রথম সাত মাসে কোনো মাসেই হত্যাকাণ্ডের মামলা ২৫০টির নিচে নামেনি। এতে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৯ থেকে ১০টির মতো হত্যাকাণ্ডের মামলা হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।
পুলিশ অবশ্য বলছে, চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতার মতো কিছু অপরাধ আগের তুলনায় কমেছে। তবে খুনের ঘটনা একইভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, স্থানীয় বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও হঠাৎ তৈরি হওয়া অস্থিরতার অনেক ঘটনা আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব হয় না। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক সহিংসতা। প্রতীকী ছবি
রাজনৈতিক সংঘাতেও বাড়ছে প্রাণহানি
হত্যাকাণ্ডের বড় একটি অংশের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৯৭৪ জন এবং নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৭ জন।
এর মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘাতে চারজন, জামায়াত ও বিএনপির সংঘাতে নয়জন এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৬ জন নিহত হয়েছেন বলে সংগঠনটির হিসাবে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে অন্তত ৪০ জন দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান মনে করেন, নির্বাচিত সরকারের সময়ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। পদ-পদবি ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে সংঘাতের দায় সরকারকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
মব সহিংসতায় সাত মাসে ১৩৪ মৃত্যু
খুনের পাশাপাশি মব সহিংসতাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় নিহত হয়েছেন ৫০ জন এবং চট্টগ্রামে ৩১ জন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কোনো অভিযোগের তদন্ত ও বিচার আদালতের মাধ্যমে হওয়ার পরিবর্তে জনতার হাতে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করছে।
বর্তমান সরকারের সময়েও কমেনি হত্যাকাণ্ড
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে এ ধরনের মামলা হয়েছিল ১ হাজার ৭৮০টি।
অর্থাৎ দুই সময়ের তুলনায় হত্যাকাণ্ডের মামলা কমেনি, বরং নয়টি বেড়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১০ হাজার ৯০টি। অর্থাৎ এই শ্রেণির মামলাও বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি।
এ পরিসংখ্যান থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট, সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা এখনো পুরোপুরি ফেরেনি।
কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না?
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ নেই। রাজনৈতিক সংঘাত, ক্ষমতার আধিপত্য, মাদক, পারিবারিক বিরোধ, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতার ঘাটতি মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুকের মতে, এখন অনেকের হাতে অস্ত্র চলে গেছে। অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিরোধ ও ক্ষমতার আধিপত্যের কারণে খুন ও সহিংসতা বাড়ছে।
তার মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় মাত্রায় বিশেষ অভিযান চালানো দরকার।
অস্ত্র ও মাদক বড় কারণ
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদককে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনাও বাড়ছে। মাদক ব্যবসা, সেবন ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সেই বিরোধ হত্যাকাণ্ডে গড়াচ্ছে।
রংপুরে একই পরিবারের চারজন হত্যার ঘটনায় পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে, নিহত শিক্ষক পরিবারের সদস্যদের বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। পরে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি।
তবে এই ঘটনার তদন্ত নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য, আটক ব্যক্তিদের দেওয়া জবানবন্দি এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত নিয়ে নতুন করে তদন্ত চলছে। তদন্তভার ইতোমধ্যে গোয়েন্দা বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, একটি হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার করাই শেষ কথা নয়। হত্যার প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং তদন্তে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়েছে কি না, সেসব বিষয়ও নিশ্চিত করা জরুরি।
পুলিশের দাবি, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে
পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে না।
অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, দস্যুতা, ডাকাতি ও চুরির ঘটনা কমেছে। তবে খুনের ঘটনা একইভাবে কমেনি। স্থানীয় বিরোধ ও অস্থিরতার অনেক ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
পুলিশের দাবি, রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই তারা কাজ করতে পারছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তবে অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের প্রশ্ন, যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে কেন প্রতিদিন গড়ে ১০টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হচ্ছে? কেন মব সহিংসতায় সাত মাসে ১৩৪ জন প্রাণ হারাচ্ছেন? কেন রাজনৈতিক সংঘাতে শত শত মানুষ হতাহত হচ্ছেন?
দ্রুত বিচার নয়, দরকার কার্যকর প্রতিরোধ
অপরাধ দমনে কোনো একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডে দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার বা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করলেই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করে স্থানীয় পর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধ দ্রুত মীমাংসা, পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষ করে কোনো হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য যদি পরে প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তাই প্রতিটি বড় হত্যাকাণ্ডে বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি তদন্তের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে পরিসংখ্যান বলছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা এখনো বড় উদ্বেগের কারণ। প্রতিদিন গড়ে ১০টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হওয়ার বাস্তবতা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ এবং মানুষের নিরাপত্তাবোধের জন্যও বড় প্রশ্ন।