মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহের পেছনে কারণ কি?
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিন দেশের এই প্রতিরক্ষা…
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় চারজনকে হত্যার ঘটনায় তদন্তের গতিপথে নতুন একটি সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে। নিহত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি ও জমি দখলের চেষ্টা থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা পুলিশ। এরই মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক জিন্নাত আলী নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি নির্মাণ করা জমির বিক্রয় দলিল সংগ্রহ করেছেন।
২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নর্থইস্ট নিউজ দাবি করেছে, মরদেহ উদ্ধারের কয়েক দিন পর গণপতির এক স্বজনের কাছ থেকে ওই দলিল সংগ্রহ করেন জিন্নাত আলী। প্রতিবেদনের দাবি, তদন্তকারীরা জমির মালিকানা ও সম্পত্তির সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
তবে প্রকাশ্যে পুলিশ এখনো জমি দখলকে হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হিসেবে ঘোষণা করেনি। বরং ২ সেপ্টেম্বরও পুলিশ জানিয়েছে, মামলার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। আদালতের অনুমতি অনুযায়ী তাদের কারাগারের ফটকে দুই দিন তিন ঘণ্টা করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
যে জমিকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন
গণপতি চক্রবর্তী যে জমির ওপর তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন, সেই জমির আয়তন প্রায় ছয় শতক বলে নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জমিটি তিনি স্থানীয় বাসিন্দা বিনয় দাসের কাছ থেকে কিনেছিলেন।
গণপতি তখন রংপুর জেলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ১৩ থেকে ১৪ বছর আগে তিনি জমিটি প্রায় ১৮ লাখ টাকায় কেনেন। বর্তমানে ওই সম্পত্তির মূল্য প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ টাকা হতে পারে বলে স্থানীয় পর্যায়ে হিসাব করা হচ্ছে।
নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একই এলাকার বিনয় দাসের কাছ থেকে স্থানীয় এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিধান দাস দুই শতক জমি কিনেছিলেন ৩৫ লাখ টাকায়। এই জমি কেনাবেচার তথ্যও তদন্তকারীরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রংপুরের গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জমির দাম বেড়েছে। মচ্ছুয়াপাড়া ও আশপাশের এলাকায় খালি জমির পরিমাণও কমে এসেছে। ফলে বিদ্যমান জমির ওপর দখল বা মালিকানা নিয়ে বিরোধের ঝুঁকি বেড়েছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করছেন।
তদন্তে কেন গুরুত্বপূর্ণ জমির দলিল?
এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে জমির দলিল সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কয়েকটি কারণে। প্রথমত, নিহত পরিবারের বাড়িটি যে জমিতে নির্মিত, সেটির বর্তমান বাজারমূল্য ও পূর্বের ক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, একই এলাকার জমি কেনাবেচায় বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেনের তথ্য সামনে এসেছে। তৃতীয়ত, স্থানীয়ভাবে জমি দখল, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এসব তথ্য সত্য হলে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হিসেবে তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার কারণ রয়েছে। তবে জমির দলিল সংগ্রহ করা বা জমির মূল্য বেশি হওয়া একাই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য প্রমাণ করে না।
তদন্তকারীদের এখন খুঁজে বের করতে হবে, গণপতি চক্রবর্তীর জমি বা বাড়ি নিয়ে কোনো বিরোধের লিখিত বা মৌখিক প্রমাণ ছিল কি না, তাকে কোনো ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না, জমি হস্তান্তর বা দখলের জন্য কেউ চাপ দিয়েছিল কি না এবং হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না।

রংপুরে একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ছবিঃ সংগৃহীত
চাঁদাবাজির অভিযোগ, সামনে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন
নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, গণপতি চক্রবর্তী তার সম্পত্তি নিয়ে চাপ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে আপস করতে রাজি ছিলেন না। এ কারণে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও চাঁদাবাজ চক্রের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে ধীমান ভট্টাচার্য ও তার ছেলে পরান ভট্টাচার্যের নামও এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে সম্পত্তি ও চাপ প্রয়োগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথা বলা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এমন তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান সামু এবং রংপুর পুলিশের অন্তত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে গণপতি চক্রবর্তীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তবে এটিও প্রতিবেদনে স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ হিসেবে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বা এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
এদিকে পরান ভট্টাচার্য হত্যাকাণ্ডের পর থেকে পলাতক রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে পুলিশ তাকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করেছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
গণপতির সঞ্চয় নিয়েও প্রশ্ন
হত্যাকাণ্ডের আগে গণপতি চক্রবর্তীর আর্থিক অবস্থাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অবসর নেওয়ার পর তিনি তার পেনশন তহবিল থেকে ১৪ লাখ টাকার বেশি উত্তোলন করে আগস্টের শুরুতে ব্যাংক হিসাবে জমা করেছিলেন।
এই অর্থের একটি অংশ চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেয়ে আগামীর বিয়ের জন্য রাখার পরিকল্পনা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে সম্পত্তির মূল্য, ব্যাংকে থাকা অর্থ এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিকল্পনা হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নির্ধারণে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।

মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। ছবিঃ সংগৃহীত
হত্যার ঘটনায় দুই তরুণকে ঘিরে অনিশ্চয়তা
গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামি ও ছেলে আয়ুষকে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। ২২ আগস্ট মচ্ছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন একই এলাকার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের জবানবন্দিতে হত্যার বিভিন্ন বিবরণ উঠে এসেছে। তদন্তকারীরা সেই বক্তব্য ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক তথ্য ও অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। পুলিশ একই সঙ্গে অন্য কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করছে।
কিন্তু তদন্তের এই পর্যায়ে দুই তরুণের ভূমিকা নিয়েই নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের মাদক সেবনের দাবি যাচাই করতে করা পরীক্ষায় কোনো মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। ৩০ আগস্ট কারাগারে তাদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং ৩১ আগস্ট প্রকাশিত ফলাফলে ইয়াবা, গাঁজা বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ মাদকের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে।
তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনার প্রায় ১০ দিন পর নমুনা সংগ্রহ করায় হত্যার রাতে তারা মাদক গ্রহণ করেছিলেন কি না, শুধু এই পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে।
মূল হত্যাকারী, নাকি সহায়ক ভূমিকা?
নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকারীরা এখন এমন সম্ভাবনাও বিবেচনা করছেন যে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ হয়তো সরাসরি চারজনকে হত্যার মূল ভূমিকায় ছিলেন না। তারা হত্যাকাণ্ডের সময় বাড়ির আশপাশে নজরদারি বা অন্য কোনো সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকতে পারেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
এই তত্ত্বের পক্ষে এখনো প্রকাশ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ সামনে আসেনি। তবে পুলিশ যে একাধিক ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে, সেই সম্ভাবনা তদন্ত করছে, তা তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়েছে।
আরও বড় প্রশ্ন
এই মামলায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, চারজনকে কেন হত্যা করা হয়েছিল?
শুধু ডাকাতি বা মাদক সেবনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, নাকি এর পেছনে সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি কিংবা অন্য কোনো স্বার্থ কাজ করেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
পুলিশ এরই মধ্যে তদন্ত গোয়েন্দা শাখায় স্থানান্তর করেছে এবং পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ২ সেপ্টেম্বর পুলিশ জানিয়েছে, দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা হত্যার রহস্য উদঘাটনের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে আশা করছে।
ফলে এখন তদন্তের সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথ রয়েছে। একদিকে আদালতে দেওয়া জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক তথ্যের সঙ্গে আসামিদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা; অন্যদিকে গণপতি চক্রবর্তীর সম্পত্তি, জমির দলিল, আর্থিক লেনদেন এবং সম্ভাব্য বিরোধের সূত্র ধরে হত্যার উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করা।
এই দুই তদন্তের ফলই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে, মচ্ছুয়াপাড়ার ওই বাড়িতে চারজনকে হত্যার পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল এবং হত্যাকাণ্ডে আসলে কতজন জড়িত ছিলেন।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ
আরও পড়ুন-
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au