পরিকল্পনা করে বাংলা ভাষা বিকৃত করা হয়েছিল: শুভেন্দু অধিকারী
পশ্চিমবঙ্গের আগের তৃণমূল সরকারের আমলে শিক্ষা ব্যবস্থা ও বাংলা ভাষার পাঠ্যক্রমে পরিকল্পিতভাবে পরিবর্তন আনা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, বাংলা…
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিন দেশের এই প্রতিরক্ষা জোটকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলা হচ্ছে। চুক্তির মূল নীতির মধ্যে রয়েছে, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি ঘোষণার পর বাংলাদেশও এতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকারের কয়েকজন উপমন্ত্রী জানিয়েছেন, আমন্ত্রণ পেলে ঢাকা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
এই অবস্থায় সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সরাসরি যুক্ত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের আগ্রহের পেছনে নিরাপত্তার পাশাপাশি কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাবও থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ বড় শক্তিগুলোর সংঘাতে সরাসরি কোনো পক্ষ নেওয়া থেকে সতর্ক থেকেছে। একই সঙ্গে মক্কা চুক্তির তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশের মতো বাংলাদেশের সামনে তাৎক্ষণিক কোনো বড় সামরিক হুমকি নেই বলেও বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হলে বাংলাদেশ এমন কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে কি না, যার সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি স্বার্থ নেই। কারণ চুক্তির মূল ভিত্তিই হচ্ছে এক সদস্যের ওপর হামলাকে অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, বাংলাদেশের আগ্রহের অন্যতম কারণ হতে পারে নিজেদের কূটনৈতিক ও কৌশলগত পরিসর আরও বিস্তৃত করা। তাঁর মূল্যায়ন, বাংলাদেশ এখন শুধু নিকটবর্তী অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে।
মক্কা চুক্তির তিন দেশের প্রত্যেকের কাছ থেকেই বাংলাদেশ আলাদা ধরনের সুবিধা পেতে পারে। পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। তুরস্ক উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর সৌদি আরব অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলে বাংলাদেশ একই সঙ্গে সামরিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ পেতে পারে। বিপরীতে বাংলাদেশও এই জোটকে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত অবস্থান এবং উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতার কারণে বাড়তি গুরুত্ব দিতে পারে।
ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়টিও বাংলাদেশের অবস্থানে একটি ভূমিকা রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছিলেন, মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিশ্বের ‘মুসলিম পরিবারের’ অভ্যন্তরীণ বিষয়। তিনি এর আগে বলেছিলেন, আমন্ত্রণ পেলে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে বিষয়টি বিবেচনা করবে।
তবে অর্থনৈতিক স্বার্থও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি, প্রবাসী আয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বার্থ জড়িত। বিশেষ করে তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মূল্যায়ন।
অন্যদিকে, মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দিকও থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বর্তমান সরকার তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির সঙ্গে যুক্ত করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও বলেছেন, দেশের স্বার্থই পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে থাকবে এবং বাংলাদেশ আর কারও কাছে মাথা নত করবে না।
ভারতকে ঘিরে বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক বাস্তবতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সীমান্ত চার হাজার কিলোমিটারের বেশি। ফলে বাংলাদেশের বড় ধরনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত ভারতের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত আনার বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এশিয়ার কয়েকটি দেশ সফর করলেও এখনো ভারত সফর করেননি। ফলে মক্কা চুক্তি নিয়ে ঢাকার আগ্রহকে ভারতের প্রতি একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবেও কেউ কেউ দেখছেন।
অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মূল্যায়ন, বাংলাদেশ সম্ভবত ভারতসহ বড় শক্তিগুলোকে বোঝাতে চাইছে যে তাদের হাতে একাধিক কৌশলগত বিকল্প রয়েছে। অর্থাৎ কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে ঢাকা একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে।
এখানে পাকিস্তান ও তুরস্কের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কও সাম্প্রতিক সময়ে আগের তুলনায় উষ্ণ হয়েছে। মক্কা চুক্তি ঘোষণার আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা যোগাযোগ বাড়তে শুরু করেছিল।
তবে বাংলাদেশ সরাসরি এই জোটে যোগ দেবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ নেওয়া হলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সামরিক জোটে না জড়ানোর নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়টিও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্পর্শকাতর।
এই কারণে অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, বাংলাদেশ এখনই সরাসরি সদস্য হওয়ার পরিবর্তে কোনো ধরনের সহযোগী বা পর্যবেক্ষক মর্যাদা বিবেচনা করতে পারে। এতে জোটের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো সম্ভব হবে, আবার সরাসরি যৌথ প্রতিরক্ষা দায়বদ্ধতায়ও যেতে হবে না।
সব মিলিয়ে মক্কা চুক্তি ঘিরে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে সরাসরি সামরিক জোটে যোগদানের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ এখনো নেই। বরং কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিকল্প খোলা রাখা, সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো এবং একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই বিষয়টি দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
শেষ পর্যন্ত ঢাকা শুধু আগ্রহ প্রকাশ করেই থামবে, নাকি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সহযোগী কাঠামোয় যুক্ত হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। তবে মক্কা চুক্তি ঘিরে বাংলাদেশের অবস্থান ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত রাজনীতিতে নতুন একটি আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au