পাঁচ মাস আগে জামিনে বেরিয়ে এবার নিজের ঘুমন্ত বাবাকে কুপিয়ে হত্যা
নরসিংদীর শিবপুরে পারিবারিক কলহের জেরে ঘুমন্ত বাবাকে ছুরিকাঘাত ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বড় ছেলের বিরুদ্ধে। এ সময় বাবাকে রক্ষা করতে…
চট্টগ্রামের রাউজানে প্রকাশ্যে মুহাম্মদ করিম নামে এক যুবদল কর্মীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে একদল সন্ত্রাসী। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ৪ থেকে ৫টি মোটরসাইকেলে করে আসা কয়েকজন অস্ত্রধারী কেরানীহাট বাজারে করিমকে ঘিরে ফেলে। তাঁদের একজন কিরিচ দিয়ে তাঁর ঘাড় ও মাথায় কোপ দেন। রক্তাক্ত অবস্থায় করিম মাটিতে পড়ে গেলে কয়েকজন তাঁকে গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাউজান উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কেরানীহাট বাজারে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মুহাম্মদ করিম হারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। বাজারটি তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে।
হত্যাকাণ্ডের পর রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কেরানীহাট বাজারের প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ। আশপাশের এলাকাতেও ছিল থমথমে পরিস্থিতি। বাইরে মানুষের চলাচল ছিল খুবই কম। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার পর সড়কের ওপর প্রায় এক ঘণ্টা করিমের লাশ পড়ে ছিল। পরে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শত বছরের পুরোনো এই বাজারে এর আগে এভাবে প্রকাশ্যে কাউকে হত্যার ঘটনা তাঁরা দেখেননি। হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও আতঙ্কে রয়েছেন।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, করিমের শরীরে তিনটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। পেট, ঊরু ও নিতম্বে গুলি লাগে তাঁর। একটি গুলি কোমরের পাশ দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বেরিয়ে যায়। এ ছাড়া তাঁর ঘাড় ও কপালে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সময় বাজার ও আশপাশের এলাকায় কোনো বন্ধ ক্যামেরা ছিল না। ফলে ঘটনাটি তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের পাশাপাশি অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
দুই বছর আগে দেশে ফেরেন করিম
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুহাম্মদ করিম দীর্ঘদিন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে প্রবাসজীবন কাটিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর বিএনপির বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। এলাকায় তিনি যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে তাঁর কোনো সাংগঠনিক পদ ছিল না বলে জানিয়েছেন রাউজান উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আজম।
হত্যাকাণ্ডের পর রাত ১০টার দিকে করিমের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বড় ভাইয়ের ঘরের সামনে ১০ থেকে ১২ জন প্রতিবেশীকে বসে থাকতে দেখা যায়। তাঁরা করিমের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় করিম দেশে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। পরে বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় বিদেশে পাড়ি জমান। প্রায় দুই বছর আগে দেশে ফেরার পর তিনি এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, এ সময় তিনি মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
করিম পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের আমান বাজার এলাকায় বসবাস করতেন। দিনের বেলায় মাঝেমধ্যে নিজের এলাকায় আসলেও রাতে সাধারণত আমান বাজারের বাসায় ফিরে যেতেন। তাঁর পরিবারে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।
অন্তত ১০ মামলার আসামি ছিলেন করিম
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মুহাম্মদ করিমের বিরুদ্ধে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় চুরি, মাদক, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মতো অভিযোগ রয়েছে। তিনি একাধিকবার কারাগারেও ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুহাম্মদ বেলায়াত হোসেন বলেন, সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে করিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের পর বাজার দ্রুত লোকশূন্য হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার কারণ বা হামলাকারীদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, করিমের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, অস্ত্রধারীরা করিমের শরীরে তিন জায়গায় গুলি করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে।
রাউজানে ধারাবাহিক সহিংসতার অভিযোগ
রাউজানে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী বাজারের চৌমুহনী এলাকায় একদল অস্ত্রধারী গুলি করে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে হত্যা করে। তাঁর বয়স ছিল ৪৮ বছর।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হয়েছে বলে তাদের তথ্য। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে এবং এসব ঘটনায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
মুহাম্মদ করিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি। কারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত এবং কী কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au