বাংলাদেশ

আইসিটি শুনানিতে জলদস্যুকে কীভাবে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী বানানো হলো?

  • 6:19 pm - September 04, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৯ বার
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ছবিঃ সংগৃহীত

আলকাস মালিকের মৃত্যুর ১৫ বছর পর সেই ঘটনার বর্ণনা কি হঠাৎ বদলে গেছে? সুন্দরবনের জলদস্যু দল ‘রাজু বাহিনী’র সঙ্গে যুক্ত ট্রলারচালক আব্বাস মালিক এখন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে হাজির হয়েছেন। তবে তাকে নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে তার অতীত পরিচয় ও ২০১১ সালের সেই অভিযানের প্রকৃত ঘটনা ঘিরে।

গত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন আব্বাস মালিক। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাকে ‘ট্রলারচালক’ ও ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে একটি অনুসন্ধানে আব্বাস মালিকের অতীত পরিচয় সামনে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, আব্বাস মালিক ও তার ভাই আলকাস মালিক দুজনই সুন্দরবনের জলদস্যু দল ‘রাজু বাহিনী’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আব্বাসের বিরুদ্ধে নিরীহ জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের অপহরণ এবং নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, ২০১১ সালে আসলে কার অভিযানে আলকাস মালিক নিহত হয়েছিলেন?

অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, জলদস্যুদের বিরুদ্ধে ওই অভিযান চলার সময় মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের গোয়েন্দা শাখার প্রধান ছিলেন। সে সময় সুন্দরবনে পরিচালিত কোনো অভিযানে তার সরাসরি উপস্থিত থাকার কারণও স্পষ্ট ছিল না বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।

তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনে পরিচালিত ওই অভিযানটি র‌্যাব-৮-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনিরের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। তার সঙ্গে ছিলেন উপ-অধিনায়ক মেজর সাব্বির। ঘটনার পর বিভিন্ন টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে অভিযানটিকে র‌্যাব-৮ পরিচালিত অভিযান হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে রাজু বাহিনীর চার সদস্য নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন আলকাস মালিকও। পরবর্তী সময়ে সুন্দরবনে জলদস্যু দমনে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আত্মসমর্পণকারী ও সাবেক জলদস্যুদের পুনর্বাসনে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় সরকার।

সেই পুনর্বাসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে আব্বাস মালিক র‌্যাব-৮-এর অধীনে মালি হিসেবে চাকরি পেয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাহলে প্রায় ১৫ বছর পর সেই একই মৃত্যুর দায় কীভাবে তৎকালীন র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানের ওপর বর্তাল, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং তার জামায়াতপন্থী প্রসিকিউশন দলের সদস্যরা বিভ্রান্তিকর তথ্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে ‘জলদস্যু আব্বাস মালিক’কে একজন ‘ট্রলারচালক’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে ২০১১ সালের অভিযানের সময় জিয়াউল আহসানের উপস্থিতির একটি বর্ণনাও তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিবেদনটির দাবি, তাজুল ইসলামের তৈরি করা এই বর্ণনাতেই আব্বাস মালিক পরবর্তীতে মামলার একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সামনে এসেছেন। তাজুল ইসলাম প্রধান প্রসিকিউটরের পদ থেকে অব্যাহতি পেলেও এখনও নেপথ্য থেকে এ বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে আরও দাবি করা হয়েছে, পুরো ঘটনার যে বর্ণনা তৈরি করা হয়েছে, সেটি তাজুল ইসলামের তৈরি করা এবং আব্বাস মালিক সেই বর্ণনায় একজন সাক্ষীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাজুল ইসলাম নিজেও কয়েক মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপের মাধ্যমে একই বক্তব্য প্রচার করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত বিভিন্ন পেজ থেকেও এই বর্ণনা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এদিকে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে ঘিরে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। গত সেপ্টেম্বর তিনি ট্রাইব্যুনালে তাকে হাতকড়া ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানোর নিয়ম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করেছিলেন। সে সময় ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণ করে বলেছিল, তাকে পাঁচ গজ দূর থেকেই নয়, এমনকি এক গজ দূর থেকেও স্নাইপারের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব।

জবাবে জিয়াউল আহসান বলেছিলেন, ট্রাইব্যুনালে এমনভাবে লক্ষ্য স্থির করে হামলা চালানোর সুযোগ নেই এবং সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থাও অনেক বেশি কঠোর। ইচ্ছেমতো কেউ তাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারবে না বলেও তিনি দাবি করেন। এ কারণে হাতকড়া ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি চান তিনি। পরে ট্রাইব্যুনালও তাকে স্নাইপারের সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারেন বলে পর্যবেক্ষণ করে।

আব্বাস মালিককে ঘিরে আরও একটি বিষয়ও সামনে এসেছে। সুন্দরবনের সাবেক ও আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ২০১৮ সালে তিনি র‌্যাব-৮-এর অধীনে মালি হিসেবে চাকরি পেয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে বা পরে তার বিরুদ্ধে অন্য একটি হত্যা মামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালে তাকে আরেকটি হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ওই মামলায় সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশায় পরবর্তীতে আব্বাস মালিককে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে সামনে আনা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১১ সালের ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনির বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিচ্ছেন এবং আলকাস মালিকের মৃত্যুর দায় জিয়াউল আহসানের ওপর চাপিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে আলকাস মালিকের মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি উদ্‌ঘাটন করা অসম্ভব নয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ ২০১১ সালে র‌্যাব-৮-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনিরের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানের ভিডিও ফুটেজ থাকলে সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভিডিওতে অভিযানের নেতৃত্ব, ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিলেন এবং কীভাবে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছিল, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

ফলে প্রায় দেড় দশক পর আলকাস মালিকের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে যে বর্ণনা সামনে এসেছে, তার সঙ্গে তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদন, অভিযানের নথি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং ভিডিও ফুটেজ মিলিয়ে দেখা হলে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ

এই শাখার আরও খবর

কোপানোর পর গুলি, ঘটনাস্থলেই যুবদল কর্মীর মৃত্যু

চট্টগ্রামের রাউজানে প্রকাশ্যে মুহাম্মদ করিম নামে এক যুবদল কর্মীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে একদল সন্ত্রাসী। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ৪ থেকে ৫টি মোটরসাইকেলে করে আসা…

সাভারে শিশু ধর্ষণ মামলায় এক সপ্তাহ পর মাদ্রাসায় অভিযান, গ্রেপ্তার নেই

ঢাকার সাভারে এক শিশু মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হওয়ার এক সপ্তাহ পর মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। তবে অভিযুক্ত ১০ জনের কাউকেই এ…

স্পেনের উপকূলে ভাসমান নৌকা থেকে ৮০ মরদেহ উদ্ধার

স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উপকূলের কাছে ভাসমান একটি নৌকা থেকে ৮০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। একই নৌকা থেকে ৪৪ জনকে…

শুভ জন্মাষ্টমী আজ

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব জন্মাষ্টমী আজ শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হচ্ছে। সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের…

ইউক্রেনের গোলাবারুদ চুক্তি বিতর্কে এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ

ইউক্রেনকে গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য ৭ কোটি ইউরোর বেশি মূল্যের একটি চুক্তি নিয়ে বিতর্কের জেরে এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হানো পেভকুর পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২২ সাল থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর…

ডিসেম্বরেই দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা

চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশে ফিরে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au