ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা
আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তত তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। গত মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের এমন বার্তা দিতে দেখা গেছে।
অভিনন্দন জানানো হয়েছে কোনো সাংবিধানিক বা রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিকে নয়, বরং বিএনপির দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়া নেতাদের। এসব বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল প্যাডে এবং জনসংযোগ দপ্তরের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায়। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ।
শিক্ষক সংগঠনের নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ তিন উপাচার্যের প্রত্যেকেই অতীতে বিএনপি-সমর্থিত শিক্ষক সংগঠনের নেতৃত্বস্থানীয় দায়িত্বে ছিলেন। ফলে দলীয় নেতাদের অভিনন্দন জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, একজন শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করতেই পারেন। কিন্তু উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ পদে নিয়োগ পাওয়া নেতাকে অভিনন্দন জানানো হলে সেটি ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের সীমা ছাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের প্রশ্ন তৈরি করে।
ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ১৬ মার্চ থেকে ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে। এসব নিয়োগের বড় একটি অংশে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে।
গত মার্চে সাতটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। বিএনপির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও বিএনপি-সমর্থিত শিক্ষক সংগঠনগুলোর নথি অনুযায়ী, ওই আটজনের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনোভাবে বিএনপি-সমর্থিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল। তাদের কয়েকজনের দলীয় পদেও থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়। অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য অধ্যাপক মামুন আহমেদকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমানকে কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি জিয়া পরিষদের সভাপতি এবং জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের উপদেষ্টা ছিলেন।
এসব নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা হলে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন নিয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কোনো ব্যক্তির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকা অপরাধ কি না। তার বক্তব্য ছিল, নিয়োগপ্রাপ্তদের গবেষণা, প্রকাশনা, সাইটেশন ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করেই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর আগে গত ১৪ মে সরকার ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে পরিবর্তন আনে। শিক্ষক সংগঠনগুলোর সূত্রের দাবি, তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে এসব পরিবর্তনের পর জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিও অভিযোগ করে, নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য এবং রাজনৈতিক বিবেচনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থিত শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে উপাচার্য নিয়োগের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
২০২২ সালে দ্য ডেইলি স্টারের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৪৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মধ্যে ৩৯ জনই সরকার-সমর্থিত শিক্ষক সংগঠনের কোনো না কোনো পদে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত নীল দলের সঙ্গে যুক্ত একাধিক শিক্ষক পরবর্তী সময়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অভিযোগও অতীতে উঠেছে। ২০২২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন এবং ২০২১ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উদযাপনের মতো ঘটনাও আলোচনায় আসে। ২০১৯ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।
এই পুরোনো বিতর্কের মধ্যেই এবার বিএনপি নেতাদের অভিনন্দন জানানো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে অভিনন্দন
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রুহুল কবির রিজভীর দায়িত্ব পাওয়ার পর গত ২০ আগস্ট তাকে অভিনন্দন জানান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ওই বার্তায় রিজভীর নতুন দায়িত্বে সফলতা কামনা করা হয়। একই সঙ্গে তার নেতৃত্বে বিএনপি আরও এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
অধ্যাপক কামরুল এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বার্তাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের সময় তিনি ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলেন। বিষয়টি নজরে আসার পর তিনি সেটি সরিয়ে দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত অভিনন্দন বার্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম থেকে আলাদা রাখা উচিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, গত ১৭ আগস্ট গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মো. নাজমুস সাদাত বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া চার নেতাকে অভিনন্দন জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের মাধ্যমে প্রকাশিত ওই বার্তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বিএনপি নেতাদের শুভেচ্ছা জানানো হয়। তাদের অভিজ্ঞতা নতুন দায়িত্ব পালনে সহায়ক হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
নথি অনুযায়ী, গত ১৯ জুলাই গোবিপ্রবির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান নাজমুস সাদাত। এর আগে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
পরে গত ২৫ আগস্ট তাকে গোবিপ্রবির উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দপ্তর থেকে কোনো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ পদে নিয়োগ পাওয়া নেতাদের অভিনন্দন জানানো কতটা যুক্তিসঙ্গত, এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তরও দেননি তিনি। তবে তিনি বলেন, তারও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
এদিকে বিএনপি নেতা ফরহাদ হালিম ডোনার দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাড ব্যবহার করা হয়। বার্তায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানানো হয়।
অধ্যাপক রেজাউল করিম বিএনপি-সমর্থিত একটি শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাড ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাকে অভিনন্দন জানানোর বিষয়ে জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
নৈতিকতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
উপাচার্যদের এমন অভিনন্দন বার্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এ ধরনের বার্তা দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত ছিল।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা নতুন কিছু নয়। পাকিস্তান আমল থেকেই এর চর্চা রয়েছে। তবে অতীতে বিষয়গুলো এতটা প্রকাশ্য ও প্রত্যক্ষ ছিল না। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কোনো ধরনের দ্বিধা ছাড়াই প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মো. তানজীমউদ্দীন খানের মতে, বিষয়টি ক্ষমতার কেন্দ্রে ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ধরে রাখা এবং তোষামোদ সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
সাবেক ইউজিসি সদস্য তানজীমউদ্দীন খান প্রশ্ন তোলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক বা শিক্ষার্থী কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট উপাচার্য তার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারবেন কি না।
তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পদায়ন, নিয়োগ কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে চরম দলীয় আচরণ থাকা উচিত নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখে মনে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবারও পুরোনো রাজনৈতিক প্রভাবের পথেই ফিরে যাচ্ছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au