ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাজ্যসভার সদস্য হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। ছবিঃ সংগৃহীত
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং তাঁর সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে মন্তব্য করেছেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাজ্যসভার সদস্য হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা কী বলছেন, সেটি তাঁর নিজের বিষয় এবং এর সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
বুধবার ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে অ্যাডামাস বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড ব্রিকস: দ্য ওয়ে এহেড’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ উঠে আসে।
শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন, এ বিষয়ে শ্রিংলার কাছে জানতে চান সাংবাদিকরা। জবাবে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা কী বলছেন, সেটি তাঁর নিজের এবং বাংলাদেশের মধ্যকার বিষয়। ভারত সরকারও একাধিকবার স্পষ্ট করেছে যে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন বা বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
শ্রিংলা বলেন, শেখ হাসিনা তাঁর নিজের বক্তব্য নিজেই দিয়েছেন এবং সেসব বক্তব্যের দায়ও তাঁর নিজের। এ বিষয়ে ভারত সরকারের অবস্থান আলাদা এবং সেটি আগেও পরিষ্কার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে সাবেক এই ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ভারত সবসময় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। দুই দেশের জনগণের স্বার্থেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং ঐতিহাসিক। দুই দেশের মধ্যে নানা ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহযোগিতা রয়েছে। তাই ভবিষ্যতেও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা জরুরি।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, সেটি ভবিষ্যতে কাটবে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবেও ইতিবাচক মন্তব্য করেন শ্রিংলা।
তিনি বলেন, কোনো না কোনো সময় দুই দেশকে একসঙ্গে কাজ করতেই হবে। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও পারস্পরিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে শ্রিংলা বলেন, এখন বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তাই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কাজ করাটা স্বাভাবিক।
তাঁর মতে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সরকার ও জনগণের স্বার্থে সম্পর্ককে ইতিবাচক পথে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ সময় দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়েও কথা বলেন শ্রিংলা।
তিনি বলেন, ভারত তার ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এর আগে জি-৭ সম্মেলনেও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশ নেবে কি না, সেটি বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
শ্রিংলা বলেন, বাংলাদেশ সম্মেলনে অংশ নিলে দেশটির জন্য বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে অন্য দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার স্বার্থ ও অবস্থান তুলে ধরতে পারে। একই সঙ্গে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের সুযোগও তৈরি হয়।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছে, সেটি কীভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, সে বিষয়ে শ্রিংলা বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও সহযোগিতামূলক পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আবারও স্বাভাবিক ও সহযোগিতামূলক পথে ফিরে আসবে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে সরাসরি কোনো সময়সূচি বা ভারতের অবস্থান না জানিয়ে শ্রিংলা মূলত বিষয়টিকে শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সরকারের বাইরে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
ফলে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে ভারতের সাবেক এই শীর্ষ কূটনীতিকের বক্তব্যে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান প্রকাশ না পেলেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে তাঁর বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।