রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) টিঅ্যান্ডটি তার ভান্ডার কার্যালয়ে চোর সন্দেহে আটক এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বিটিসিএল কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়ার অভিযোগে ওই যুবককে আটক করা হয়। পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
আটক যুবককে কে বা কারা মারধর করেছে, তা নিয়ে এখন পরস্পরকে দায়ী করছে বিটিসিএল ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা। আনসার সদস্যদের দাবি, যুবককে আটকের পর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর তাদের আর কোনো দায়িত্ব ছিল না। অন্যদিকে বিটিসিএল কর্মচারীদের অভিযোগ, আনসার সদস্যরাই যুবককে পিটিয়েছেন।
তবে উভয় পক্ষের বক্তব্য থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, বাইরে থেকে এসে অন্য কেউ ওই যুবককে মারধর করেনি। ঘটনার মূল অংশটি ঘটেছে বিটিসিএলের তেজগাঁও কার্যালয়ের ভেতরেই। ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে, কার হেফাজতে থাকা অবস্থায় যুবকটি নির্যাতনের শিকার হন এবং কার পিটুনিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে?
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ বলছে, সুরতহাল প্রতিবেদনে যুবককে পেটানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে আনসার সদস্য কিংবা বিটিসিএলের কোনো কর্মচারী জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ৭টার দিকে কয়েকজন যুবক বিটিসিএলের তেজগাঁও টিঅ্যান্ডটি তার ভান্ডার এলাকায় ঢুকে পড়েন। বিষয়টি দেখতে পেয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা তাদের ধাওয়া করেন। এ সময় একজনকে আটক করা হয়। পরে ওই যুবককে বিটিসিএল কার্যালয়ের ভেতরে নেওয়া হয়।
চোর সন্দেহে আটক করার পর যুবকটির ওপর মারধর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। পিটুনিতে অচেতন হয়ে পড়ার পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তবে তখনও নিহত যুবকের পরিচয় জানা যায়নি। ঘটনার প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তাঁর পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। ফলে পরিবারের সদস্যদেরও সন্ধান পাওয়া যায়নি এবং এ ঘটনায় এখনো নিয়মিত মামলা হয়নি।
ঘটনার পর বিটিসিএল কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো. সাইফুল ইসলাম ও ওই এলাকার কেয়ারটেকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শওকত আলীকে আটক করে পুলিশ। মামলা না থাকায় তাদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে। আটক দুজনকে ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। নিহত যুবকের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। কার পিটুনিতে চোর সন্দেহে আটক যুবকের মৃত্যু হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর বুধবার সকাল ১১টার দিকে বিটিসিএলের ওই কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এলাকাজুড়ে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা পুরো স্থাপনাটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। পুরোনো ও জরাজীর্ণ বেশ কয়েকটি ভবন রয়েছে সেখানে। কোথাও টিনশেড ভবন, কোথাও পাকা স্থাপনা। পুরোনো গাড়ি, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও টেলিফোনের তারসহ নানা সরঞ্জাম পড়ে আছে।
তেজগাঁও রেলগেটের কাছে অবস্থিত এ স্থাপনাটি বর্তমানে বিটিসিএলের টেলিফোন ও যোগাযোগের তার এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতি রাখার প্রধান গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের সেখানে প্রবেশ বা চলাচল খুব একটা নেই।
দুটি ফটকের একটি বন্ধ ছিল। অন্য ফটকে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করছিলেন। পুরো এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অঙ্গীভূত আনসার সদস্যরা। সম্প্রতি সেখানে আনসারের একটি নতুন প্লাটুনও যুক্ত হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে বিটিসিএলের কর্মচারীদের কাছ থেকে পাওয়া বক্তব্যেও ভিন্নতা রয়েছে। অফিস সহকারী নুরুল ইসলাম প্রথমে দাবি করেন, তিনি ওই যুবকের মৃত্যুর বিষয়ে কিছু জানেন না। পরে জানান, অফিস খোলার আগে প্রাচীর ডিঙিয়ে একজনকে ঢুকতে দেখে আনসার সদস্যরা তাকে আটক করেন।
তিনি বলেন, সকাল সোয়া ৯টার দিকে অফিসে এসে বিষয়টি জানতে পারেন। পরে আনসার সদস্যদের থাকার ভবনের নিচে একটি লোহার পিলারের সঙ্গে যুবকটিকে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুবকটিকে দেখে মনে হয়েছিল, তাকে বেশ মারধর করা হয়েছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলার সময় পাশে থাকা বিটিসিএলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারের ব্যক্তিগত সহকারী সুলতান মাহমুদের ইশারায় তিনি কথা থামিয়ে দেন। পরে তিনি বলেন, রাতে বাসায় ফিরে খবরের মাধ্যমে জানতে পারেন ওই যুবক মারা গেছেন।
বিটিসিএলের জুনিয়র কার্যসহকারী ওবায়দুল্লাহও বলেন, চোর আটক হয়েছে শুনে তিনি আনসার ক্যাম্পে যান। সেখানে লোহার পিলারের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় যুবকটিকে দেখতে পান। তাঁর কথাবার্তাও অসংলগ্ন ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ওবায়দুল্লাহর অভিযোগ, আনসার সদস্যরাই ওই যুবককে মারধর ও পিটুনি দিয়েছেন।
অন্যদিকে ঘটনার সময় বিটিসিএল এলাকার ভেতরে থাকা আনসার ক্যাম্পের প্লাটুন কমান্ডার নুরুল ইসলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনি জানান, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কয়েকজন যুবক বিটিসিএল এলাকায় ঢুকে পড়েন। গেটে দায়িত্বে থাকা অঙ্গীভূত আনসার সদস্য শাহজামাল একজন যুবককে চুরি করতে দেখেন এবং তাকে ধাওয়া করেন। পালানোর সময় ওই যুবক পুরোনো টিনের চালের ওপর দিয়ে দৌড়ানোর একপর্যায়ে চাল ভেঙে নিচে পড়ে যান।
পরে বিটিসিএলের স্টাফ শওকত হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে তাকে আটক করা হয় বলে জানান আনসার প্লাটুন কমান্ডার।
নুরুল ইসলামের দাবি, তখনো বিটিসিএল অফিস খোলেনি। সংস্থার টেলিফোনিক নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা আটক যুবককে নিয়ে আসেন। টিনের চাল ভেঙে পড়ে যাওয়ায় তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে কেটে যায় এবং মাথায় আঘাত লাগে। তবে তখন তাঁর অবস্থা গুরুতর ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
পরে অফিস খোলার পর বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের ব্যক্তিগত সহকারী সুলতান মাহমুদকে ঘটনাস্থলে আসতে বলা হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আটক যুবককে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় অফিস সহকারী সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি।
নুরুল ইসলামের দাবি, এরপর আনসার সদস্যরা নিজেদের দায়িত্বস্থলে ফিরে যান।
বিটিসিএল কর্মচারীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আনসার সদস্যরা কোনো ধরনের নির্যাতন করেননি। এমনকি আটক যুবকের নামও জিজ্ঞাসা করা হয়নি।
বরং বিটিসিএল কর্মচারীরাই যুবককে পিটিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে তিনি নিজে ওই মারধর দেখেছেন কি না, জানতে চাইলে বলেন, তিনি দেখেননি।
নুরুল ইসলাম দাবি করেন, এর আগেও ওই এলাকায় চোর ধরে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং তাদের মারধরের অভিযোগও ছিল। এ কারণে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আনসারের পক্ষ থেকে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। ওই চিঠির গ্রহণপত্র পুলিশকে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ঘটনাস্থলের লোহার পিলার দেখিয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, আটক যুবককে সেখানে পর্যন্ত আনসার সদস্যরা নিয়ে গিয়েছিলেন এবং বেঁধে রেখেছিলেন। এরপর বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের লোকজন আসার পর তাকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আনসারের তেজগাঁও অঞ্চলের অ্যাডজুটেন্ট সেকেন্দার আলী বলেন, আনসার সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের কোনো সুযোগ নেই এবং এ ধরনের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আনসারও ঘটনাটি তদন্ত করছে। কোনো আনসার সদস্যের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে বিটিসিএলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারের ব্যক্তিগত সহকারী সুলতান মাহমুদ বলেন, আটক যুবককে আনসার সদস্যরাই পিটিয়েছেন। তাদের কাছে যুবককে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তবে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খবর পাওয়ার পরও কেন পুলিশকে জানানো হয়নি, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। পুলিশকে জানানোর দায়িত্ব আনসার সদস্যদের বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বিটিসিএলের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক রওনক তাহমিনা ঘটনার বিষয়ে লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠানোর অনুরোধ করেছেন। তিনি জানান, বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর পর অনুমতি ও তথ্য পাওয়া গেলে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।
ঘটনাস্থল কাভার করা সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট রয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ। ফলে ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যাবে কি না, সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে।
তবে পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলের আশপাশের এবং অন্য কোনো ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ডিএমপির তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের সহকারী কমিশনার সাইদুর রহমান শেখ বলেন, সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই যুবককে পেটানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। আনসার সদস্য কিংবা বিটিসিএল কর্মচারী, যে বা যারাই এ ঘটনায় জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, নিহত যুবককে ভবঘুরে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করতে সময় লাগছে।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাস্থল কাভার করে এমন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে যুবককে আটক করা হয়। সাড়ে ১০টার মধ্যে তাকে বিটিসিএল হেফাজতে পাওয়ার কথা বলা হলেও পুলিশকে খবর দেওয়া হয় দুপুর আড়াইটার পর। এই সময়ের মধ্যে যুবকটি কোথায় ছিলেন, কী অবস্থায় ছিলেন এবং তাঁর ওপর কী ঘটেছিল, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, যুবককে নির্যাতন বা পিটুনি দেওয়া হয়েছিল কি না, কারা তা করেছে এবং কখন করেছে, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এমনকি ওই যুবক চুরি করলেও তাকে পিটিয়ে হত্যার অধিকার কারও নেই। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা ফৌজদারি অপরাধ।
ফলে এখন পুলিশের তদন্তে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে হাসপাতালে নেওয়ার আগ পর্যন্ত ওই যুবক কার হেফাজতে ছিলেন এবং ওই সময়ের মধ্যে তাঁর ওপর কী ঘটেছিল। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আটক দুই ব্যক্তির ভূমিকা এবং আনসার ও বিটিসিএল কর্মীদের বক্তব্য যাচাই করেই এ প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।