মেলবোর্ন ২৯ জুন- আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি)-এর প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২১ জুন ২০২৫ সিডনির এয়ারপোর্ট পুলম্যান হোটেল বলরুমে অনুষ্ঠিত হয় এক জাঁকজমকপূর্ণ, হৃদয়ছোঁয়া ও স্মরণীয় অ্যালামনাই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত এআইইউবি-এর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন “এআইইউবি অ্যালামনাই অস্ট্রেলিয়া (এএএ)”-এর আয়োজনে এই উৎসবটি পরিণত হয় এক উজ্জ্বল মিলনমেলায়, যেখানে সিডনি, মেলবোর্ন, পার্থ, ক্যানবেরা সহ বিভিন্ন শহর থেকে শতাধিক গ্র্যাজুয়েট ও তাঁদের পরিবার, প্রিয় শিক্ষক ও শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ‘Acknowledgement of Country’-এর মাধ্যমে, যার মাধ্যমে স্থানীয় আদিবাসীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। এরপর পরিবেশিত হয় অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, যা দুই দেশের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংযোগের অনন্য প্রতীক হিসেবে অনুষ্ঠানটিকে এক আন্তর্জতিক আবহে আবৃত করে।
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে সবাইকে স্বাগত জানানো হয় এবং এই মহতী উদ্যোগের পেছনের পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য ও শ্রমের কথা তুলে ধরা হয়। এরপর শুরু হয় বক্তৃতা পর্ব। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এআইইউবি’র প্রতিষ্ঠাতা ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারপারসন মিস নাদিয়া আনোয়ার এবং প্রাক্তন উপাচার্য ও ট্রাস্টিজ বোর্ড সদস্য ড. কারমেন জে. লামাগনা। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে এআইইউবি’র ৩০ বছরের গর্বময় যাত্রা—একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এআইইউবি কিভাবে একটি প্রগতিশীল ও মূল্যবোধভিত্তিক উচ্চশিক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে, তার সার্বিক চিত্র। তাঁরা অ্যালামনাইদের স্বতন্ত্র অর্জন ও প্রবাসে তাঁদের অবদানকে গভীর শ্রদ্ধা ও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন।
বক্তব্যের পরপরই শুরু হয় অ্যালামনাইদের স্মৃতিচারণ। শিক্ষাজীবনের মধুর স্মৃতি, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রেরণা এবং এআইইউবি থেকে অর্জিত শিক্ষা জীবনে বাস্তব প্রয়োগ—এই সব কিছুই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে উপস্থাপন করেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের বক্তব্যে আবেগ, কৃতজ্ঞতা ও গর্ব মিশে এক অনন্য আবহ তৈরি হয়।

অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত এআইইউবি-এর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন “এআইইউবি অ্যালামনাই অস্ট্রেলিয়া (এএএ)”
এরপর শুরু হয় সম্মাননা স্মারক প্রদান পর্ব। পেশাগত অগ্রগতি, সমাজে ইতিবাচক অবদান ও অনুষ্ঠানটিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত অ্যালামনাইদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক স্পন্সরদের এবং এআইইউবি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যদেরও সম্মান জানানো হয়, যাঁরা এই আয়োজন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
বক্তব্য ও সম্মাননার পর অংশগ্রহণকারীদের জন্য পরিবেশিত হয় মনোজ্ঞ বুফে ডিনার। খাবারের গুণমান, পরিবেশ এবং বৈচিত্র্য প্রশংসাযোগ্য ছিল। হাস্যোজ্জ্বল পরিবেশে সবার মিলিত অংশগ্রহণ যেন এই আনন্দকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। ডিনার চলাকালীন পরিচালিত হয় একটি পেশাদার ফটোসেশন, যা Photolia দ্বারা আয়োজিত হয়। অতিথিরা পরিবার, বন্ধু ও প্রিয় সহপাঠীদের সঙ্গে স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধরে রাখেন।
শিশুদের জন্য ছিল একটি সম্পূর্ণ আলাদা হলরুম, যেখানে ফেস পেইন্টিং, ম্যাজিক শো, বেলুন টুইস্টিং, গল্প বলা, বিভিন্ন খেলা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাঁদের জন্য এক আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি করা হয়। এই আয়োজনে পেশাদার কেয়ারওয়ার্কার ও বিনোদনকর্মীরা নিযুক্ত ছিলেন এবং শিশুদের জন্য বিশেষ বুফে খাবারেরও ব্যবস্থা করা হয়। অভিভাবকরা তাই নিশ্চিন্তে মূল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পেরেছেন। এতে পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক, পারিবারিক ও যত্নশীল আবহ সৃষ্টি হয়।
ডিনারের পর শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, যেখানে মঞ্চ দখল করে একের পর এক চমকপ্রদ উপস্থাপনা। অ্যালামনাই মেহজাবিন ও শাকিল দম্পতির পুত্র ছোট্ট ওয়াকিফের নৃত্য পরিবেশনা সকলকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। এরপর আসে আমাদের অ্যালামনাই নামিদ ও আয়শা দম্পতির লোকসঙ্গীত ব্যান্ড “চারু”র পারফরম্যান্স, যা বাংলার মাটির গন্ধ এনে দেয় সিডনির এই মিলনমেলায়। শিল্পী মাহমুদ খান ও অ্যালামনাই আশরাফুল মিনহাজের পরিবেশনা এবং “ক্রিস্টি” ব্যান্ডের উজ্জ্বল সংগীতায়োজন পুরো সন্ধ্যা রাত কে পরিণত করে এক উৎসবমুখর আবেগঘন অভিজ্ঞতায়।
অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে অনুষ্ঠিত হয় রাফেল ড্র, যেখানে আকর্ষণীয় পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এই ড্র স্পন্সর করেন ইএসআই গ্লোবাল এবং ইনভেস্টমেন্টাল। এ অংশে অতিথিদের অংশগ্রহণে মেতে ওঠে আনন্দ ও উত্তেজনার এক ভিন্ন ধারা।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে। আয়োজক কমিটি সকল অ্যালামনাই, তাঁদের পরিবার, স্পন্সর, শিল্পী ও নিরলস স্বেচ্ছাসেবকদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অনুষ্ঠানের পর্দা নামায়।
এই আয়োজনে টাইটেল স্পন্সর ছিলেন ইএসআই গ্লোবাল। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্পন্সরদের মধ্যে ছিলেন রেইন অ্যান্ড হোর্ন বার্ডিয়া, দ্য ড্রিমক্যাচার – ইন্টেরিয়রস অ্যান্ড লাইফস্টাইল, ইনভেস্টমেন্টাল – মর্টগেজ ব্রোকার সার্ভিস, অস্টার সোলার, মাহমুদ গ্রোসার এবং রাশেজ – ক্যাম্পবেলটাউন। তাঁদের সকলের উদার সহযোগিতা ছাড়া এই অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না।
এআইইউবি অ্যালামনাই অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, এই মিলনমেলা শুধু একটি উদযাপন নয়, বরং এটি একটি চলমান যাত্রার সূচনা—যেখানে ভবিষ্যতে আরও মেন্টরশিপ, প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিং, ওয়েবিনার এবং সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম সংগঠিত করা হবে। এ অনুষ্ঠানটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ হওয়া মানেই সম্পর্কের ইতি নয়; বরং তা একটি আজীবন বন্ধনের সূচনা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে চলে।