মতামত

সম্ভ্রমহানির চিৎকার ও রাষ্ট্রের লজ্জা: সংখ্যালঘু সুরক্ষার অনিশ্চিত পথ

  • 10:44 pm - June 30, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৪৩ বার
ধর্ষণের প্রতীকী ছবি

মেলবোর্ন ৩০ জুন- বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো—বিশেষত প্রকাশ্যে একজন নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও—যে মাত্রায় তীব্র ধাক্কা দিয়েছে, তা আমাদের নৈতিকতার সীমানাকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। এই একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে একটি অসহায় নারী যখন চিৎকার করে সম্ভ্রম বাঁচানোর আকুতি জানায়, তখন শুধু তারই সম্ভ্রম নয়—আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র, আমাদের সমাজবোধ এবং আমাদের মানবিকতা সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার যে ধারাবাহিকতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা নিতান্তই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মার্কিন কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমের (২০২৫) বার্ষিক প্রতিবেদনেও স্পষ্ট বলা হয়েছে—সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি মুখস্থ বক্তব্যের বেশি কিছু নয়। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বারবার প্রমাণ করছে, প্রতিরোধের যথাযথ নীতি, স্বচ্ছতার সাথে দ্রুত বিচার ও নিরপেক্ষ তদন্ত এই রাষ্ট্রযন্ত্রে আজও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।

আরও উদ্বেগজনক হলো, এই ধরনের ঘটনা ঘটলেই রাজনৈতিক দলগুলো তৎক্ষণাৎ পরস্পরের দিকে আঙুল তোলে—কেউ বিএনপির দিকে, কেউ আওয়ামী লীগের দিকে দোষ চাপায়। তারপর যে–যার ‘মিডিয়া সেল’ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়। এই ঘটনায়ও তাই হলো। কেউ বলল ‘পরকীয়ার জের’, কেউ বলল ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ’। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন নারীকে বিবস্ত্র করে হেনস্তা করা কি কোনো অবস্থাতেই ন্যায়সংগত ব্যাখ্যা পেতে পারে? এমন সময় অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা আরও বেশি নিরপেক্ষ, দৃঢ় এবং ন্যায়নিষ্ঠ হওয়ার কথা ছিল। সরকার বাহাদুর বড় জোর বলতে পারে, মুরাদ নগরের এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদেরকে আইনের সর্বোচ্চ আওতায় নিয়ে আসা হবে -এ পর্যন্তই!

অন্তর্বর্তী কালীন সরকারের ধর্মীয় নিরপেক্ষতা!

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কমিশনগুলোতেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনো কণ্ঠ স্থান পায়নি। সংবিধান সংস্কার কমিশনে সংখ্যালঘুদের কোনো প্রতিনিধি নেই, নেই নির্বাচন সংস্কার কমিশনেও। এমনকি, প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে যেসব আসন ‘সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর’ জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতেও সরাসরি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কথা বলা নেই। বরং কমিশন স্পষ্ট ভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতাকে ‘বিভ্রান্তির উৎস’ আখ্যা দিয়ে বিভাজনের বীজ বপন করেছে।

যদি রাষ্ট্রধর্মের বেষ্টনীতে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, তাহলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কীভাবে কার্যকরভাবে সুনিশ্চিত হবে? আজ যারা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান—মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯%—তাদের সংসদে কতজন প্রতিনিধি থাকতে পারে বা থাকতে দেওয়া হবে এ নিয়ে কি কোনো চিন্তাভাবনা সংস্কার কমিশনে থাকা উচিত ছিল না? অথচ এক সময় (১৯৫৪ সালে) পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যালঘু প্রতিনিধি ছিলেন ৭২ জন। এই বাস্তবতা আমাদের জানান দেয়—সংখ্যাগত উপস্থিতি কেবল ভোটের নয়, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিরও।

বিচারের প্রশ্নেও একই সংকট। যখন সহিংসতার ভিডিও ভাইরাল হয়, রাষ্ট্র নড়েচড়ে বসে। অভিযুক্তকে রাতারাতি গ্রেফতার করা হয়। অথচ যতদিন ঘটনা প্রকাশ্য হয়নি, ততদিন প্রশাসন নিশ্চুপ থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে—তাহলে কি এই বিচার শুধু সামাজিক চাপের ফল? যদি অন্তর্বর্তী সরকার সত্যিই নিরপেক্ষ হতো, তবে এতগুলো ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সুযোগ পেত না।

মব ভায়োলেন্স এক ভয়াবহ সংস্কৃতি! 

মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, মাত্র সাত মাসে গণপিটুনির ১১৪টি ঘটনা—এ পরিসংখ্যান আমাদের লজ্জায় ডোবায়। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা, ধর্ষণ, মন্দিরে অগ্নিসংযোগ, দেশ ছাড়ার হুমকি, গণহারে মামলা—এসব ‘নির্বাচনের পরিণতি’ বা ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে দায় এড়ানো যায় না।

আমাদের রাষ্ট্রের জন্য এখন সময় এসেছে অন্তর্দৃষ্টি অর্জনের—সংখ্যালঘু সুরক্ষাকে কোনো দয়া নয়, বরং সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় জিরো টলারেন্স প্রমাণ করতে হবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আচরণ ও রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে।

সর্বশেষ ভিডিওর সেই নারীর চিৎকার আমাদের collective conscience-কে আর কতকাল বিব্রত করবে? প্রতিদিন নীরবে কতজন মানুষ এই নির্যাতন সইছে, তার হিসাব কি আমরা রাখি? এই রাষ্ট্রযন্ত্র যদি সংখ্যালঘুদের ন্যায়বিচার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, বাংলাদেশ কেবলমাত্র স্লোগান হয়েই থাকবে।

নির্যাতনের বিচার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ‘নিরপেক্ষতা’র খোলস ভেঙে সংখ্যালঘু সুরক্ষাকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে না আনলে, এই সহিংসতা কোনো দিন থামবে না। আজ যেটি এক নারীর ওপর, কাল সেটি আরও অনেকের ওপর নেমে আসতে পারে-এবং সেরকম একটি আশঙ্কা আজ সকলের মনে।

এই অবক্ষয়ের শেষ কোথায়—প্রশ্ন রাখছি রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের কাছে।

প্রদীপ রায়, সম্পাদক, OTN Bangla

এই শাখার আরও খবর

মুন্সীগঞ্জে হিন্দু নারী কবিরাজ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, প্রতিবেশী মীর হোসেন গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে হিন্দু নারী ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ রেখা রাণী রায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘদিন…

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে গ্রেপ্তার ৪, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন চারজন। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আদালতে…

সমাধানের পথ নেই, বাংলাদেশের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি

মেলবোর্ন, ০৭ মার্চ- ইরানের সাথে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের রেশ সবচেয়ে বেশি যেসব দেশে পড়েছে বাংলাদেশ তার…

ব্যাংক হিসাবের বাইরে রয়েছে গোপন সম্পদ? প্রশ্নের মুখে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেই উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতি,…

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ: বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার অমর দিকনির্দেশনা

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বাঙালি জাতির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ দিনটি এক অনন্য, অবিস্মরণীয় এবং গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৭১ সালের এই…

ট্রাম্পের যুদ্ধ, বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চল ও বিশ্বের সম্পর্কের মানচিত্র

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সামরিক সংকট নয়; এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au