অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বড় শহরে রোববার অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ৩১ আগষ্ট- অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বড় শহরে রোববার (৩১ আগস্ট) অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। ‘মার্চ ফর অস্ট্রেলিয়া’ নামের একটি সংগঠন এই সমাবেশের ডাক দেয়। তারা সরকারের ‘বড় পরিসরে অভিবাসন’ নীতির বিরোধিতা করে বলছে, ব্যাপক অভিবাসনের কারণে সমাজে ভাঙন তৈরি হচ্ছে।
সরকার অবশ্য এই কর্মসূচির নিন্দা জানিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতারা একে ‘বিদ্বেষ ছড়ানো আয়োজন’ হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঘৃণা ও বিভাজনের কোনো স্থান নেই।
বিক্ষোভের আয়োজক কারা?
‘মার্চ ফর অস্ট্রেলিয়া’র আয়োজকদের পরিচয় পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। সংগঠনের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেখা যায় তারা নিজেদেরকে চরমপন্থীদের থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এর মধ্যেই কুখ্যাত নব্য-নাৎসি নেতা টমাস সিউয়েল সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছেন, এই কর্মসূচি তাদের আন্দোলনের অংশ।
আয়োজকদের ওয়েবসাইটে তেমন তথ্য নেই, তবে একটি শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—এই মিছিলে কোনো বিদেশি পতাকা বহন করা যাবে না।

‘মার্চ ফর অস্ট্রেলিয়া’ নামের একটি সংগঠন এই সমাবেশের ডাক দেয়। ছবিঃ রয়টার্স
পাল্টা কর্মসূচি
অভিবাসনবিরোধী সমাবেশের বিপরীতে সিডনি ও মেলবোর্নে একই সময়ে পাল্টা সমাবেশ ডাকে বিভিন্ন বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন। রিফিউজি অ্যাকশন কোয়ালিশন জানিয়েছে, তাদের কর্মসূচি “বিদ্বেষের রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ” প্রকাশ করছে।
কুইন্সল্যান্ডে বিক্ষোভস্থলের কাছেই আয়োজন করা হয় একটি বহুসাংস্কৃতিক খাদ্য উৎসব, যা বৈচিত্র্য ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়।
একই দিনে সিডনিতে আরও দুটি বড় অনুষ্ঠান হয়—ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল এবং সিডনি ম্যারাথন, যেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ অংশ নেন।
পুলিশের প্রস্তুতি
বিক্ষোভ ঘিরে বড় ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় পুলিশ। নিউ সাউথ ওয়েলসে প্রায় এক হাজার পুলিশ নামানো হয় সিডনির অভ্যন্তরীণ এলাকায়। ভারপ্রাপ্ত উপকমিশনার পিটার ম্যাককেনা জানান, এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে বিরোধী পক্ষের বিক্ষোভকারীরা মুখোমুখি না হন।
ভিক্টোরিয়া পুলিশ মেলবোর্ন সিবিডিকে বিশেষ নিরাপত্তা অঞ্চল ঘোষণা করে। সেখানে অস্ত্র অনুসন্ধান, মুখোশ খোলার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয় পুলিশকে। তারা আশঙ্কা করছে, অভিবাসনবিরোধী ও বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হতে পারে।
পুলিশের মতে, ডানপন্থী ও চরমপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী অনেকে এসব সমাবেশে যোগ দিতে পারে।
সরকারের অবস্থান
অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার একে বিদ্বেষ ছড়ানো কর্মসূচি হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, “আমরা আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার পাশে আছি। এসব বিক্ষোভ অস্ট্রেলীয় মূল্যবোধের সঙ্গে যায় না।”
বহুসাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রী অ্যান্ড্রু জাইলস (আলি নয়, আসল নাম) বলেন, যারা বিভাজন তৈরি করতে বা অভিবাসীদের ভয় দেখাতে চায়, তাদের অস্ট্রেলিয়ায় কোনো জায়গা নেই।
বিরোধীদলীয় নেতা সুসান লে শান্তিপূর্ণ আচরণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “অস্ট্রেলিয়ায় মতপ্রকাশ ও প্রতিবাদের অধিকার আছে। তবে তা অবশ্যই শান্তিপূর্ণ হতে হবে। সহিংসতা, বর্ণবাদ বা ভয় দেখানোর কোনো স্থান নেই।”
গ্রিনস দলের নেতারা বলেছেন, এটি বিদ্বেষ ছড়ানো কর্মসূচি। তাদের মতে, কিছু উগ্রবাদী বিভাজন তৈরি করতে চাইছে বটে, তবে অস্ট্রেলিয়ার আসল শক্তি হচ্ছে সহমর্মিতা ও অভ্যর্থনা।
সমাবেশে উপস্থিতি ও বিতর্কিত রাজনীতিক
অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (এবিসি) জানিয়েছে, সিডনির সমাবেশে প্রায় পাঁচ থেকে আট হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। পাল্টা সমাবেশে যোগ দেয় কয়েক শত মানুষ।
মেলবোর্নের কেন্দ্রীয় শহরাঞ্চলেও একইভাবে বড় সমাবেশ হয়। কুইন্সল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে যোগ দেন প্রবীণ রাজনীতিক বব ক্যাটার। তিনি এর আগে এক সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, তাঁর লেবানিজ বংশোদ্ভূত পরিচয় নিয়ে কেউ মন্তব্য করলে তিনি ঘুষি মেরেছেন। রোববার তিনি নিজ দলের পক্ষ থেকে ওই অভিবাসনবিরোধী কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই অভিবাসী অথবা অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে দক্ষিণপন্থী চরমপন্থার উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বিশেষ করে নব্য-নাৎসি গোষ্ঠীর কার্যক্রম বাড়ছে।
চলতি বছর অস্ট্রেলিয়ায় আইন করে নাৎসি স্যালুট ও সন্ত্রাসী প্রতীক প্রদর্শন বা বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে ইহুদিবিদ্বেষী হামলা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই আইন করা হয়।
সুত্রঃ এবিসি নিউজ ও রয়টার্স