জামায়াতের এমপির ওপর হামলার অভিযোগ, গাড়ি ভাঙচুর করে অবরুদ্ধ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৫ এপ্রিল- নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের আতকাপাড়া এলাকায় অবস্থিত গিরিপথ ফিলিং স্টেশনে জামায়াতের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার ওপর হামলা, তাঁর ব্যবহৃত গাড়ি ভাঙচুর এবং তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে। পরে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। হামলার জন্য স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের দায়ী করেছেন সংসদ সদস্য নিজেই, যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিএনপি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত গিরিপথ ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল বিক্রি চলছিল। এরপর নিয়ম অনুযায়ী পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে সেখানে পৌঁছান এবং পাম্পের মালিক মোহাম্মদ কামালের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তিনি পাম্পের একটি কক্ষে নামাজ আদায় করতে যান। এই সময়ের মধ্যেই ১৫টির মতো মোটরসাইকেলে করে ২০ থেকে ২৫ জন যুবক সেখানে এসে তেল নেওয়ার চেষ্টা করেন। পাম্প বন্ধ থাকায় তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে ওই যুবকেরা সংসদ সদস্যের গাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। নামাজ শেষ করে বের হওয়ার পর মাছুম মোস্তফাকে লক্ষ্য করে ধাওয়া দেয় তারা এবং তাঁকে ঘিরে ফেলে অবরুদ্ধ করে রাখে। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা কর্মী-সমর্থকেরা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা বলেন, তিনি পাম্পে তেল নিতে গিয়েছিলেন। তখন ২০ থেকে ২৫ জন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী তাঁর ওপর হামলা চালায়, গাড়ি ভাঙচুর করে এবং তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখে। তাঁর দাবি, তাঁর কর্মী-সমর্থকেরাও হামলার শিকার হয়েছেন। পরে পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তিনি আইনি পদক্ষেপ নেবেন বলেও জানিয়েছেন।
ঘটনার সময় ফিলিং স্টেশনে কয়েকজন পুলিশ সদস্য দায়িত্বে থাকলেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হন। পরে পূর্বধলা থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এসে প্রায় আধা ঘণ্টা পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সংসদ সদস্যকে উদ্ধার করে। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পাঠানো একটি গাড়িতে করে তাঁকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন নেতা-কর্মী সেখানে জড়ো হয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং সংসদ সদস্যের গাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা লোকজনকেও মারধর করা হয়। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে আগে থেকেই কয়েকজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সংসদ সদস্যকে উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
রাত পৌনে আটটার দিকে সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা মুঠোফোনে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রশাসন ও পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-৫ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে মাছুম মোস্তফা ৮২ হাজার ১৭৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী আবু তাহের তালুকদার পান ৭৯ হাজার ৪১২ ভোট।
এদিকে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবু তাহের তালুকদার। তিনি বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি শুনেছেন, তবে কারা এটি ঘটিয়েছে সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না এবং তাঁর দলের কোনো নেতা-কর্মী এতে জড়িত নয়।
ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মাওলানা ছাদেক আহমাদ হারিছ এবং সেক্রেটারি মোহাম্মদ বদরুল আমিন যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। তারা দাবি করেন, সংসদ সদস্য একটি মাদ্রাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে ফেরার পথে ফিলিং স্টেশনে গাড়ি রেখে নামাজ পড়তে গেলে তাঁর গাড়ির ওপর শতাধিক লোক হামলা চালায়। শুধু গাড়ি ভাঙচুরই নয়, মসজিদ ঘেরাও করে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
বিবৃতিতে তারা বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের ঘটনা স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি এবং এতে একটি পরিকল্পিত অস্থিরতা তৈরির ইঙ্গিত রয়েছে। হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে তারা বলেন, অন্যথায় এর দায়ভার প্রশাসনকেই নিতে হবে।
ঘটনাটি স্থানীয় রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।