প্যালেস্টাইনি প্রিজনারস ডে পালন করার সময় হেবরনে ছবিটি ধরে রেখেছেন এক আন্দোলনকারী। ছবি : রয়টার্স
মেলবোর্ন, ৬ সেপ্টেম্বর-গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক হাজারো ফিলিস্তিনির মধ্যে মাত্র চার ভাগের এক ভাগকে প্রকৃত যোদ্ধা বলে মনে করছে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক যৌথ অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধানটি পরিচালনা করেছে ইসরায়েলি–ফিলিস্তিনি সাময়িকী প্লাস নাইন সেভেন টু, হিব্রু ভাষার সাময়িকী লোকাল কল এবং ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান।
২০০২ সালের ইসরায়েলের ‘অবৈধ যোদ্ধা আইন’ অনুযায়ী, কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ না থাকলেও হামাস বা অন্য কোনো ‘অবৈধ’ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে তাকে আটক করা যায়। এই আইনের আওতায় বহু ফিলিস্তিনিকে বন্দী করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে রয়েছেন—
- ৮২ বছর বয়সী এক আলঝেইমার রোগী নারী, যিনি ছয় সপ্তাহ কারাগারে ছিলেন।
- এক একলা মা, যাকে সন্তানদের থেকে আলাদা করা হয়েছিল। পরে তিনি দেখেন, তার বাচ্চারা রাস্তায় ভিক্ষা করছে।
ইসরায়েলের সামরিক তথ্যভান্ডারে হামাস ও প্যালেস্টাইন ইসলামিক জিহাদের (পিআইজে) অন্তর্ভুক্ত হিসেবে ৪৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে এর মধ্যে গত মে মাসে মাত্র ১ হাজার ৪৫০ জনকে ‘গ্রেপ্তার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ ইসরায়েলের হাতে আটক থাকা প্রায় ৬ হাজার ফিলিস্তিনির তিন-চতুর্থাংশের কোনো প্রমাণ নেই যে তারা হামাস বা পিআইজির সদস্য। গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের সংখ্যা বন্দীদের মধ্যে ২ শতাংশেরও কম।
৭ অক্টোবরের হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে প্রায় ৩০০ ফিলিস্তিনি এখনো ইসরায়েলে বন্দী। ইসরায়েলের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে বিচার চালানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
নির্যাতন, মৃত্যু ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
বন্দীদের প্রতি ইসরায়েলি বাহিনীর নির্যাতনের অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে।
- গত ফেব্রুয়ারিতে বন্দী বিনিময়ের অংশ হিসেবে মুক্তি পাওয়া ১৮৩ জন ফিলিস্তিনির শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়।
- অনুসন্ধানে পাওয়া জবানবন্দি ও ভিডিও প্রমাণে দেখা যায়, ইসরায়েলি নিরাপত্তারক্ষীরা বন্দীদের ধর্ষণ করেছে।
- ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৭৫ জন ফিলিস্তিনি বন্দী হেফাজতে মারা গেছেন।
- জাতিসংঘের জুলাই মাসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বন্দীদের ওপর কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
গাজায় চলমান যুদ্ধে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিরীহ সাধারণ মানুষকে ভুলভাবে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ বারবার উঠেছে। অনেক সাংবাদিককেও যোদ্ধা বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এমনকি হারেৎজ পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল সরকার গত বছর যে ৯ হাজার যোদ্ধা হত্যার দাবি করেছিল, তাদের বেশির ভাগই আসলে বেসামরিক মানুষ।
যৌথ অনুসন্ধানের এই তথ্য প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—ইসরায়েল কি পরিকল্পিতভাবে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ‘অবৈধ যোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে বন্দী করছে? নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত আটক ও মৃত্যুর অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্রঃআল–জাজিরা