বাংলাদেশের তিস্তা নদী। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৬ সেপ্টেম্বর- চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায় বাংলাদেশ। এ জন্য দেশটির কাছে ঋণও চেয়েছে ঢাকা। পাশাপাশি এ প্রকল্পটিতে বেইজিংয়ের যে তীব্র আগ্রহ রয়েছে, তা পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামকে জানালেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
সোমবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন চীনের রাষ্ট্রদূত। বৈঠক সূত্র জানায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ চীনের কাছে প্রায় ৫৫ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে। আর এ ঋণের বিষয়েও ইতিবাচক সাড়া রয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রকল্পটির বিষয়ে চীনের যে তীব্র আগ্রহ, তা সচিবকে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত। বাংলাদেশও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছে।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের পর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর হালনাগাদ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি চীনের অর্থায়নে বাংলাদেশে হাসপাতাল নির্মাণসহ অন্যান্য প্রকল্পের বিষয়গুলোও বৈঠকে আলোচিত হয়েছে।
এ ছাড়া চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া বৈশ্বিক সুশাসন উদ্যোগে (জিজিআই) যোগ দিতে বাংলাদেশকে আগেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিল চীন। পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠকে জিজিআইর বিস্তারিত এবং এ উদ্যোগে চীনের আগ্রহের কথা জানানো হয়। জুলাই মাসে গণঅভুত্থানের পর বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ প্রায় ৮০ কোটি ডলারের ওপর পৌঁছেছে, যা সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, তিস্তা বিষয়ে চীন বেশ আগ্রহী। এ প্রকল্পে তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সঙ্গে কাজ করছে। চলতি বছরের শেষের দিকে তিস্তা প্রকল্প যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশে আসছে একটি কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল। এ বিষয়টিও পররাষ্ট্র সচিবকে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত।
গত মার্চে প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরের পর অন্তর্বর্তী সরকার তিস্তা প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় মে মাসে পরিকল্পনা কমিশনে একটি চিঠি পাঠায়। তাতে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনের ঋণ নেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। পরে জুলাই মাসে চীনা দূতাবাসে চিঠি পাঠায় ইআরডি। চিঠিতে বলা হয়, ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে। ঢাকা চলতি বছরের মধ্যেই এ প্রকল্পের আর্থিক চুক্তি সই করতে চায়। এ লক্ষ্যে কাজ দ্রুত এগোচ্ছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অতীতে চীন ও ভারত উভয়েই আগ্রহ দেখিয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসের শুরুতে বাংলাদেশ সফরে এসে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়েত্রা তিস্তা প্রকল্পে ভারতের বিনিয়োগ আগ্রহের কথা জানান। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারও চেয়েছিল, প্রকল্পটিতে ভারত অর্থায়ন করবে।
চীন সফর নিয়ে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘চীন তো রেডি; কিন্তু আমি চাই, প্রকল্পটি করলে এই প্রকল্পের জন্য যা দরকার, ভারতই দেবে।’
তিস্তা প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ৭৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে চীনের কাছে ঋণ চাওয়া হয়েছে ৫৫ কোটি ডলার। বাকিটা সরকারি অর্থায়নে হবে। ২০২৬ সালে প্রকল্প কাজ শুরু করে ২০২৯ সালে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে এর আগে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, তিস্তা প্রকল্পে বেইজিংয়ের আগ্রহ রয়েছে। তবে প্রকল্প কাকে দিয়ে বাস্তবায়ন করানো হবে, সে সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ঢাকার। বাংলাদেশ যে সিদ্ধান্ত নেবে, চীন তা সম্মান করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ঢাকা কৌশলীভাবে এগোচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের কয়েকটি নদীর উৎপত্তিস্থল চীনে। চীন নদীতে বেশ কয়েকটি বাঁধ নির্মাণ করছে। ফলে তিস্তার মতো কৌশলগত প্রকল্পে চীনের সংশ্লিষ্টতা থাকলে নদীর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে আলোচনার সুযোগ থাকবে।