চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন বিমান বাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক বিমান। ছবিঃ আইএসপিআর
মেলবোর্ন, ১৮ সেপ্টেম্বর- বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোর পর। এরই মধ্যে খবর এসেছে, মার্কিন সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর একটি বড় দল যৌথ মহড়ায় অংশ নিতে বাংলাদেশে পৌঁছেছে। প্রশ্ন উঠছে- তাদের আগমন আসলে কেন?
ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি গোপন রাখতে পারেনি ইউনুস সরকার। বাংলাদেশ সরকারের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর(আইএসপিআর) তাড়াহুড়ো করে একটি বিবৃতির মাধ্যমে মার্কিন সেনাদের এই তৎপরতার ব্যাপারে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
মার্কিন সেনারা কোথায় অবস্থান করছে
কয়েকটি মিডিয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে একটি বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রায় ১২০ জন কর্মকর্তা চট্টগ্রামে পৌঁছান। তারা রেডিসন ব্লু হোটেলে ওঠেন। জানা গেছে, সেনাদের জন্য হোটেলের ৮৫টি রুম বুক করা হয়েছে, তবে আশ্চর্যজনকভাবে তাদের নাম অতিথি তালিকায় নেই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সেনারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে এসেছেন। তারা ২০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম ছাড়বেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঢাকায় ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে মার্কিন সেনাদের চট্টগ্রামে নিয়মিত উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ছবিঃ সংগৃহীত
রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে প্রশ্ন
মার্কিন সেনাদের আগমন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ঢাকার ওয়েস্টিন হোটেল থেকে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর কর্মকর্তা টেরেন্স আরভেল জ্যাকসনের (৫০) মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে গত ৩১ আগস্ট। তিনি এ বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তার মৃত্যু ঘিরে রহস্য থাকলেও বাংলাদেশ বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই প্রকাশ্যে মন্তব্য করেনি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দাবি, জ্যাকসন ২৯ আগস্ট বিকাল ৩টায় ওয়েস্টিনে ওঠেন। কিন্তু হোটেল সূত্র নিশ্চিত করেছে, তিনি ২৭ আগস্টই চেক-ইন করেন। পরদিন হোটেলের রেস্টুরেন্টে সকালের নাশতা ও রাতের খাবার খান। ২৯ আগস্ট বাইরে বের হলেও ৩০ ও ৩১ আগস্ট হোটেল থেকে আর বের হননি। ৩১ আগস্ট দুপুরে হাউজ কিপিং স্টাফরা রুম ৮০৮-এ তার মরদেহ পান।
মরদেহ উদ্ধারের পরপরই তিনজন মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তা হোটেলে উপস্থিত হন। তারা রুম কর্ডন করে দেন, জ্যাকসনের ব্যক্তিগত লাগেজ নিয়ে যান এবং হোটেল কর্মীদের সংবাদমাধ্যমে কিছু না বলতে নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক কার্যক্রম
১৪ সেপ্টেম্বর মিসরের বিমানবাহিনীর একটি পরিবহণ বিমান চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামে। পরদিন মার্কিন সেনারা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পতেঙ্গা এয়ারবেস পরিদর্শন করেন।

আইএসপিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক এয়ার ফোর্সের অংশগ্রহণে সাত দিনব্যাপী যে যৌথ মহড়া চলছে, তার অংশ হিসেবে মার্কিন সেনারা চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন। ছবিঃ আইএসপিআর
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ সেনারা দুটি যৌথ মহড়ায় অংশ নেয়—”টাইগার লাইটনিং” এবং “অপারেশন লাইটনিং”। কর্মকর্তাদের মতে, এসব মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল শান্তিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করা, দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সহায়তার সম্ভাব্য ক্ষেত্র খুঁজে বের করা।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
মার্কিন সেনাদের এই উপস্থিতি এমন সময়ে ঘটছে, যখন নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশ পরিচালনা করছে। শেখ হাসিনার পতনের পর সহিংস আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে এই সরকার ক্ষমতায় আসে। ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সামরিক ও কৌশলগত যোগাযোগ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এই সহিংস আন্দোলনের পেছনে আমেরিকার গোপন সহযোগিতা ছিল বলে মনে করেন একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
যৌথ মহড়ার কথা বলছে কর্তৃপক্ষ
আইএসপিআর (আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর) জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক এয়ার ফোর্সের যৌথ মহড়ার অংশ হিসেবেই মার্কিন সেনাদের অবস্থান।
‘অপারেশন প্যাসিফিক অ্যাঞ্জেল ২৫-৩’ নামে সাত দিনব্যাপী এই মহড়ার উদ্বোধন হয় গত রোববার চট্টগ্রামের জহুরুল হক বিমানঘাঁটিতে। এর উদ্বোধন করেন ঘাঁটির অধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল হায়দার আব্দুল্লাহ। এ সময় দুই দেশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাসসের তথ্য অনুযায়ী, মহড়ায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি সি-১৩০জে পরিবহণ বিমান, একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সি-১৩০জে পরিবহণ বিমান অংশ নিচ্ছে। এতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ১৫০ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৯২ জন, পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা অংশগ্রহণ করছেন।
আইএসপিআর জানিয়েছে, এই মহড়ার মূল উদ্দেশ্য হলো বিমান বাহিনীর পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, অভিজ্ঞতা বিনিময়, আন্তঃকার্যক্ষমতা জোরদার ও সহযোগিতা শক্তিশালী করা। পাশাপাশি চিকিৎসা, প্রকৌশল ও লজিস্টিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে স্থানীয় জনগণকে সেবা দেওয়াও এর অংশ, যা দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও বন্ধন দৃঢ় করবে।
এমএসএন নিউজ থেকে নেয়া। অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা