লিড নিউজ

ঢাকার আশ্রয় নেওয়া আসামের সাকিনা বেগম- চার মাস পর কীভাবে খুঁজে পেল বিবিসি

  • 9:18 pm - September 26, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৭৪ বার
চারমাস পরে সাকিনা বেগম ভিডিও কলের মাধ্যমে দেখা পেলেন তার ছেলে মেয়েদের। ছবিঃ বিবিসি বাংলা

মেলবোর্ন, ২৬ সেপ্টেম্বর- ভারতের আসামের নলবাড়ি জেলার বরকুরা গ্রামের বাসিন্দা সাকিনা বেগম (৬৫) চার মাস আগে নিখোঁজ হন। পরিবারের অভিযোগ, মে মাসে স্থানীয় পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে গিয়েছিল কাগজে সই করানোর কথা বলে। এরপর থেকেই তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

চার মাস পর, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মিরপুরে এক ঘরে তাঁকে খুঁজে পেয়েছে বিবিসি। দুই দেশের সাংবাদিকদের যৌথ অনুসন্ধানে অবশেষে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে।

থানায় ডেকে নেওয়ার পরই নিখোঁজ
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৫ মে বরকুরা গ্রাম থেকে সাকিনা বেগমকে থানায় ডেকে নিয়ে যায় স্থানীয় পুলিশ। পরিবারকে জানানো হয়, “কিছু কাগজে সই করতে হবে, তারপর তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।” কিন্তু তিনি আর ফেরেননি।
পরিবার অনেক জায়গায় খোঁজ করেও কোনো তথ্য পায়নি। প্রশাসনের কাছে গিয়ে তারা জানতে পারে, সাকিনা বেগমের নাম ‘বিদেশি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং হয়তো তাঁকে আটক শিবিরে নেওয়া হয়েছে। পরে কেউ কেউ বলেন, তাঁকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হতে পারে—কিন্তু পরিবার বিশ্বাস করতে পারেনি।

ঢাকায় মিরপুরে এক বৃদ্ধা
এদিকে, কয়েক সপ্তাহ আগে ঢাকার মিরপুরের এক এলাকায় এক বৃদ্ধা আশ্রয় নিয়েছেন বলে খবর পায় বিবিসি বাংলা। বৃদ্ধা বলেছিলেন, তাঁর নাম সাকিনা বেগম এবং তিনি ভারতের আসামের নলবাড়ি জেলার বাসিন্দা।
এই তথ্য পাওয়ার পর বিবিসির ঢাকার প্রতিবেদক তফসিরুল ইসলাম ও ভারতের গুয়াহাটির প্রতিবেদক অমিতাভ ভট্টশালী যৌথভাবে অনুসন্ধান শুরু করেন। গুগল ম্যাপে “বরকুরা” নামের একটি গ্রাম খুঁজে পাওয়া যায়, যা নলবাড়ি জেলারই অংশ। পরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সহায়তায় সেই গ্রাম থেকে সাকিনা বেগমের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

মেয়ে বললেন, “এটাই তো আমার মা”
বিবিসি ভারতীয় টিম সাকিনা বেগমের একটি ছবি পাঠায় তাঁর বড় মেয়ে রাসিয়া বেগমকে। ছবিটি দেখেই রাসিয়া কেঁদে ওঠেন, “এটাই তো আমার মা।” পরে ঢাকায় থাকা বিবিসি সংবাদদাতা ভিডিও কলে তাঁর মাকে দেখান।
স্ক্রিনে ছেলেমেয়েদের দেখে সাকিনা বেগম প্রথমেই বলেন, “এই তো আমার ছেলে-মেয়ে।” অপরদিকে গ্রামে থাকা সন্তানরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। চার মাস পর মায়ের দেখা পেয়ে তারা বলেন, “মা ভয় পেও না, আমরা তোমাকে ফিরিয়ে আনব।”
সেই দৃশ্যটি রেকর্ড করে প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।

সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামের “ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল” বহু মানুষকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যাদের অনেককে আটক করে রাখা হয়েছে, আবার অনেককে নাকি গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এভাবে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার ঘটনাগুলো “অমানবিক ও বেআইনি”। সাকিনা বেগমের ঘটনাও সম্ভবত সেই প্রক্রিয়ারই অংশ।

বাংলাদেশে তদন্ত শুরু
বিবিসি জানায়, সাকিনা বেগম বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে আশ্রয়ে আছেন। বিষয়টি স্থানীয় থানায় অবহিত করা হয়েছে। থানার এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা ঘটনাটি তদন্ত করছি। তাঁর নাগরিকতা, আগমনপথ ও অবস্থান যাচাই করা হবে।”
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাকিনা বেগম জানিয়েছেন, তাঁকে ভারতে থানায় নেওয়ার পর বলা হয়েছিল, “একটু সই করাতে হবে।” তারপর তাঁকে একটি লোহার বেড়া দেওয়া জায়গায় রাখা হয় এবং পরে বাসে করে কোথাও পাঠানো হয়। কয়েক জায়গায় থামানো হয়, কিন্তু তিনি জানতেন না তাঁকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তিনি ঢাকায় পৌঁছান।

মানবিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন
এই ঘটনাটি এখন সীমান্ত অঞ্চলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, নাগরিকত্ব নিয়ে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে অনেক নিরপরাধ মানুষকে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, আসামের নাগরিক নিবন্ধন প্রক্রিয়া (NRC) এবং ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে বহু মানুষ অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছেন। সাকিনা বেগমের ঘটনাটি সেই প্রক্রিয়ার একটি জীবন্ত উদাহরণ।

পরিবারের আর্তি
সীমান্ত পার করে দেওয়ার পর তারা কোথায় গেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন। বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কি, তাকে পাবার আদেশ হয়েছে কি—এই সব বিষয় এখনও অনিশ্চিত।

বাংলাদেশে, বিবিসি মা–বিষয়টি স্থানীয় ভাষানটেক থানায় অবহিত করেছে। তারা প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “ঘটনার তদন্ত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সাকিনা বেগম নিজেও বলেছিলেন—“থানার পুলিশ বলেছিল, একটি সই করাই হবে। তারা বলেছিল, চারিদিক লোহার বেড়া, তালা দেওয়া দরজা, শব্দ করো না… তোমাকে ধীরে ধীরে নিয়ে যাবে।” পরবর্তীতে জানা যায়, রাতেই বাসে উঠিয়ে একাধিক স্টেশনে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

বরকুরার ছেলে-মেয়েরা বলেছিলেন, “মা ছাড়া কেউ নেই আমাদের। দয়া করে মাকে ফিরিয়ে দিন…”
সাকিনা বেগমের মেয়ে রাসিয়া বেগম বলেন, “মা ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। দয়া করে মাকে ফিরিয়ে দিন। আমরা কেবল মায়ের মুখটা দেখতে চাই।”

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দেশের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত ভারতের কোনো সরকারি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সূত্র: বিবিসি অনুসন্ধান ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে।

এই শাখার আরও খবর

ব্যালন ডি’অর ২০২৬: মনোনয়ন প্রকাশ শুরু, সেরা হওয়ার দৌড়ে যারা

ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অরের ২০২৬ সালের মনোনয়ন প্রকাশ শুরু হয়েছে। মূল পুরস্কারের পাশাপাশি সেরা গোলরক্ষক, সেরা তরুণ খেলোয়াড়, সেরা কোচ ও…

ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস: শিগগিরই মিলছে চালুর নির্দিষ্ট তারিখ

ঢাকা-কলকাতা রুটে বন্ধ থাকা মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়ে শিগগিরই সুখবর দেওয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ট্রেনটি কবে…

তিন ছাত্রকে বলাৎকার, মাদরাসা শিক্ষকের কক্ষে মিলল উত্তেজক ওষুধ

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে তিন আবাসিক ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে একটি মাদরাসার প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার আবুল বাশার (৩৩) উপজেলার দুধসর এলাকার দারুল উলুম মাদরাসার প্রধান…

বাড়ির সামনে হিন্দু স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা, সোনা-টাকা ছিনতাই

নওগাঁর মহাদেবপুরে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে অলিফ চন্দ্র দত্ত (৪৫) নামে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা…

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়

​বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্রের মানসপুত্র, ক্ষণজন্মা রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার হাত ধরে এ অঞ্চলের বহু রাজনৈতিক নেতার বিকাশ ঘটেছিল। তাঁর রাজনৈতিক…

‘পুলিশ বলে, তুই বাচ্চা হারাইছিস তো আমি কী করব?’: নিখোঁজ সন্তানের অভিভাবক

রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ সন্তানের সন্ধান চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অভিভাবকরা। তাদের অভিযোগ, সন্তান নিখোঁজ হওয়ার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au