লিড নিউজ

ঢাকার আশ্রয় নেওয়া আসামের সাকিনা বেগম- চার মাস পর কীভাবে খুঁজে পেল বিবিসি

  • 9:18 pm - September 26, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৯৭ বার
চারমাস পরে সাকিনা বেগম ভিডিও কলের মাধ্যমে দেখা পেলেন তার ছেলে মেয়েদের। ছবিঃ বিবিসি বাংলা

মেলবোর্ন, ২৬ সেপ্টেম্বর- ভারতের আসামের নলবাড়ি জেলার বরকুরা গ্রামের বাসিন্দা সাকিনা বেগম (৬৫) চার মাস আগে নিখোঁজ হন। পরিবারের অভিযোগ, মে মাসে স্থানীয় পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে গিয়েছিল কাগজে সই করানোর কথা বলে। এরপর থেকেই তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

চার মাস পর, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মিরপুরে এক ঘরে তাঁকে খুঁজে পেয়েছে বিবিসি। দুই দেশের সাংবাদিকদের যৌথ অনুসন্ধানে অবশেষে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে।

থানায় ডেকে নেওয়ার পরই নিখোঁজ
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৫ মে বরকুরা গ্রাম থেকে সাকিনা বেগমকে থানায় ডেকে নিয়ে যায় স্থানীয় পুলিশ। পরিবারকে জানানো হয়, “কিছু কাগজে সই করতে হবে, তারপর তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।” কিন্তু তিনি আর ফেরেননি।
পরিবার অনেক জায়গায় খোঁজ করেও কোনো তথ্য পায়নি। প্রশাসনের কাছে গিয়ে তারা জানতে পারে, সাকিনা বেগমের নাম ‘বিদেশি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং হয়তো তাঁকে আটক শিবিরে নেওয়া হয়েছে। পরে কেউ কেউ বলেন, তাঁকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হতে পারে—কিন্তু পরিবার বিশ্বাস করতে পারেনি।

ঢাকায় মিরপুরে এক বৃদ্ধা
এদিকে, কয়েক সপ্তাহ আগে ঢাকার মিরপুরের এক এলাকায় এক বৃদ্ধা আশ্রয় নিয়েছেন বলে খবর পায় বিবিসি বাংলা। বৃদ্ধা বলেছিলেন, তাঁর নাম সাকিনা বেগম এবং তিনি ভারতের আসামের নলবাড়ি জেলার বাসিন্দা।
এই তথ্য পাওয়ার পর বিবিসির ঢাকার প্রতিবেদক তফসিরুল ইসলাম ও ভারতের গুয়াহাটির প্রতিবেদক অমিতাভ ভট্টশালী যৌথভাবে অনুসন্ধান শুরু করেন। গুগল ম্যাপে “বরকুরা” নামের একটি গ্রাম খুঁজে পাওয়া যায়, যা নলবাড়ি জেলারই অংশ। পরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সহায়তায় সেই গ্রাম থেকে সাকিনা বেগমের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

মেয়ে বললেন, “এটাই তো আমার মা”
বিবিসি ভারতীয় টিম সাকিনা বেগমের একটি ছবি পাঠায় তাঁর বড় মেয়ে রাসিয়া বেগমকে। ছবিটি দেখেই রাসিয়া কেঁদে ওঠেন, “এটাই তো আমার মা।” পরে ঢাকায় থাকা বিবিসি সংবাদদাতা ভিডিও কলে তাঁর মাকে দেখান।
স্ক্রিনে ছেলেমেয়েদের দেখে সাকিনা বেগম প্রথমেই বলেন, “এই তো আমার ছেলে-মেয়ে।” অপরদিকে গ্রামে থাকা সন্তানরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। চার মাস পর মায়ের দেখা পেয়ে তারা বলেন, “মা ভয় পেও না, আমরা তোমাকে ফিরিয়ে আনব।”
সেই দৃশ্যটি রেকর্ড করে প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।

সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামের “ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল” বহু মানুষকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যাদের অনেককে আটক করে রাখা হয়েছে, আবার অনেককে নাকি গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এভাবে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার ঘটনাগুলো “অমানবিক ও বেআইনি”। সাকিনা বেগমের ঘটনাও সম্ভবত সেই প্রক্রিয়ারই অংশ।

বাংলাদেশে তদন্ত শুরু
বিবিসি জানায়, সাকিনা বেগম বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে আশ্রয়ে আছেন। বিষয়টি স্থানীয় থানায় অবহিত করা হয়েছে। থানার এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা ঘটনাটি তদন্ত করছি। তাঁর নাগরিকতা, আগমনপথ ও অবস্থান যাচাই করা হবে।”
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাকিনা বেগম জানিয়েছেন, তাঁকে ভারতে থানায় নেওয়ার পর বলা হয়েছিল, “একটু সই করাতে হবে।” তারপর তাঁকে একটি লোহার বেড়া দেওয়া জায়গায় রাখা হয় এবং পরে বাসে করে কোথাও পাঠানো হয়। কয়েক জায়গায় থামানো হয়, কিন্তু তিনি জানতেন না তাঁকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তিনি ঢাকায় পৌঁছান।

মানবিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন
এই ঘটনাটি এখন সীমান্ত অঞ্চলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, নাগরিকত্ব নিয়ে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে অনেক নিরপরাধ মানুষকে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, আসামের নাগরিক নিবন্ধন প্রক্রিয়া (NRC) এবং ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে বহু মানুষ অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছেন। সাকিনা বেগমের ঘটনাটি সেই প্রক্রিয়ার একটি জীবন্ত উদাহরণ।

পরিবারের আর্তি
সীমান্ত পার করে দেওয়ার পর তারা কোথায় গেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন। বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কি, তাকে পাবার আদেশ হয়েছে কি—এই সব বিষয় এখনও অনিশ্চিত।

বাংলাদেশে, বিবিসি মা–বিষয়টি স্থানীয় ভাষানটেক থানায় অবহিত করেছে। তারা প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “ঘটনার তদন্ত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সাকিনা বেগম নিজেও বলেছিলেন—“থানার পুলিশ বলেছিল, একটি সই করাই হবে। তারা বলেছিল, চারিদিক লোহার বেড়া, তালা দেওয়া দরজা, শব্দ করো না… তোমাকে ধীরে ধীরে নিয়ে যাবে।” পরবর্তীতে জানা যায়, রাতেই বাসে উঠিয়ে একাধিক স্টেশনে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

বরকুরার ছেলে-মেয়েরা বলেছিলেন, “মা ছাড়া কেউ নেই আমাদের। দয়া করে মাকে ফিরিয়ে দিন…”
সাকিনা বেগমের মেয়ে রাসিয়া বেগম বলেন, “মা ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। দয়া করে মাকে ফিরিয়ে দিন। আমরা কেবল মায়ের মুখটা দেখতে চাই।”

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দেশের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত ভারতের কোনো সরকারি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সূত্র: বিবিসি অনুসন্ধান ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে।

এই শাখার আরও খবর

বৃষ্টি-ঘূর্ণিঝড়ের ধরন বদলে দিচ্ছে এল নিনো, বিশ্ব আবহাওয়ায় যে পাঁচ বড় প্রভাব

ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানল, প্রশান্ত মহাসাগরে বাড়ছে হারিকেনের তৎপরতা, ভারতে কমেছে মৌসুমি বৃষ্টি। ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রভাব থাকার আশঙ্কা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রশান্ত মহাসাগরের পানির অস্বাভাবিক…

গাজীপুরে গাড়ি চাপায় সন্তানসহ তপন চন্দ্র দাসের মৃত্যু

গাজীপুরের টঙ্গীতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গাড়ির ধাক্কায় বাবা ও ছেলে নিহত হয়েছেন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোরে টঙ্গীর গাজীপুরা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন তপন…

বিক্ষোভ ঘিরে ফ্রান্সজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা, ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন

ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও সহিংসতা মোকাবিলায় দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার। শনিবার (২৪ অক্টোবর) বিক্ষোভকারীদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এই…

পূজার ছুটি শেষে বাসায় ফিরে দেখেন, ৫০ লাখ টাকা ও ৮ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি

একটি ডাইং কারখানা গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে গ্রামের জমি বিক্রি করেছিলেন সুখন চৌধুরী (৫০)। জমি বিক্রি করে পাওয়া ৫০ লাখ টাকা রেখেছিলেন নরসিংদী শহরের ভাড়া…

সাজেকে সেনাবাহিনীর লাঠিচার্জে শতাধিক আদিবাসী আহত

রাঙামাটির সাজেকে আন্দোলনকারীদের ওপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লাঠিচার্জে শতাধিক আদিবাসী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংগঠন এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস (এসিএইচআর)। শুক্রবার প্রকাশিত এক…

পোল্যান্ড থেকে প্রত্যর্পণের পর হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ২৬ বছর বয়সী যুবক

অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের মিড-নর্থ কোস্ট এলাকায় একটি ক্যাবিনেটের ভেতর থেকে মরদেহ উদ্ধারের তিন বছর পর হত্যার অভিযোগে এক যুবককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পোল্যান্ড থেকে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au