মেলবোর্ন, ২৭ সেপ্টেম্বর- প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমস্যার দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এখনই বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবলমাত্র ১৯৬৭ সালের পূর্বের সীমারেখার ভিত্তিতে, যেখানে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকবে, তখনই ন্যায়বিচার কার্যকর হবে।
নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন ড. ইউনূস।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমি সবসময় মানুষকে আশার বাণী শুনিয়েছি, কখনো ভয় দেখিয়ে কিছু করা আমি সমর্থন করিনি। কিন্তু আজ আমাকে সেখান থেকে সরে এসে ভয়ংকর কিছু কথা বলতে হচ্ছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “চরম জাতীয়তাবাদ, অন্যের ক্ষতি হয় এমন ভূরাজনীতি, এবং অন্যের দুর্ভোগ ও পীড়নের প্রতি ঔদাসীন্য বহু দশকের পরিশ্রমে অর্জিত অগ্রগতি ধ্বংস করে দিচ্ছে।”
গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, শিশুরা না খেয়ে অকাল মৃত্যুবরণ করছে, বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, হাসপাতাল, স্কুলসহ গোটা জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত হয়ে তিনি বলেন, “আমাদের চোখের সামনেই একটি নির্বিচার গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। কিন্তু মানবজাতির পক্ষ থেকে এর অবসানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে না, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও ইতিহাস ক্ষমা করবে না।”
আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি জানালেন জাতিসংঘকে
আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির কথা জাতিসংঘকে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেন, এর পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সংস্কার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
শুক্রবার রাতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান–পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমস্যা, যুদ্ধ-সংঘাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।
তরুণদের জন্য নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গড়ার আকাঙ্ক্ষা এবং পথ নিয়েও কথা বলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল নয়টায় (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাতটা) সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পুনরায় শুরু হয়।
পরে প্রধান উপদেষ্টা ভাষণ দেন, যা বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বিটিভি নিউজ ও বাংলাদেশ বেতার সরাসরি সম্প্রচার করে।
ড. ইউনূস বলেন, “গত বছর এই মহান সভায় আমি দাঁড়িয়েছিলাম সদ্য গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত একটি দেশের রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা শোনানোর জন্য। আজ আমি সেই রূপান্তরের অগ্রযাত্রায় কতদূর এগিয়েছি, তা জানাতে এসেছি।”
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে সংস্কারের অঙ্গীকার
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠনের। ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামোকে পুনর্গঠন করতে প্রয়োজন ছিল ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের।”
তিনি বলেন, “যে বিপুল জনসমর্থনের মাধ্যমে আমরা দায়িত্ব পেয়েছিলাম, তার প্রেক্ষাপটে সহজ পথ ছিল নির্বাহী আদেশে সংস্কার চালানো। কিন্তু আমরা বেছে নিয়েছি কঠিন পথ — অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পথ।”
তিনি জানান, ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং তাদের সুপারিশ পাওয়ার কাজ চলছে।
“আমাদের লক্ষ্য হলো ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে আর কোনো স্বৈরশাসকের আবির্ভাব হবে না। কোনো নির্বাচিত নেতা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বরূপ ক্ষুণ্ন করতে পারবে না এবং রাষ্ট্র ও জনগণের রক্ষকেরা কখনো ভক্ষকে পরিণত হবে না,” বলেন তিনি।
গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘জুলাই ঘোষণা’র মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রমের সময়াবদ্ধ অঙ্গীকার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আগামী নির্বাচনে যে দলই জিতুক না কেন, সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে আর কোনো অনিশ্চয়তা থাকবে না।”
দুর্নীতির অর্থ ফেরানো সরকারে অগ্রাধিকার
ড. ইউনূস বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে সুশাসন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন রয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “দেড় দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জবাবদিহি ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না।”
তিনি আরও বলেন, “অবকাঠামো প্রকল্পগুলো রাজনৈতিক হীনস্বার্থে নেওয়া হয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, জনগণের উপকারে আসেনি। আমরা দায়িত্ব নিয়ে আবিষ্কার করেছি, কীভাবে দুর্নীতি ও সম্পদ চুরি সামষ্টিক অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করেছে।”
তিনি জানান, পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার সরকারে অন্যতম অগ্রাধিকার।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শত শত কোটি ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
“আমরা সেই সম্পদ ফেরানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু আইনি জটিলতা ও বিদেশি অনীহা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে,” বলেন তিনি।
তিনি আহ্বান জানান, “যেসব দেশ ও প্রতিষ্ঠান এই অবৈধ সম্পদ গচ্ছিত রাখছে, তারা যেন এই অপরাধের শরিক না হয়। এই সম্পদ প্রকৃত মালিক — কৃষক, শ্রমিক ও করদাতাদের কাছে ফিরিয়ে দিন।”
তিনি প্রস্তাব করেন, উন্নয়নশীল দেশ থেকে সম্পদ পাচার রোধে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে।
মিথ্যা সংবাদ ও বিভ্রান্তি নিয়ে উদ্বেগ
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “বর্তমানে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।”
তিনি উল্লেখ করেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে, যা এখনো অব্যাহত।
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ‘ডিপফেক’–এর প্রসার, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
তিনি আহ্বান জানান, এসবের বিরুদ্ধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে আস্থা ও সম্প্রীতি নষ্ট না হয়।
রোহিঙ্গা সংকটে গভীর উদ্বেগ
প্রতিবেশী মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে পুরো অঞ্চল গভীর উদ্বেগের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন ইউনূস।
তিনি বলেন, “এটি শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নয়, বরং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকেও জটিল করে তুলছে।”
তিনি জানান, গত আট বছরেও সংকটের সমাধান হয়নি, বরং বাংলাদেশে নতুন করে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা।
রাখাইনে সাংস্কৃতিক পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত, যা বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
“রোহিঙ্গা সংকট কোনোভাবেই বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নয়,” বলেন তিনি।
“বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করছে, কিন্তু তহবিল ঘাটতির কারণে ক্যাম্পে ন্যূনতম জীবনমান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
তিনি জানান, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, নতুন তহবিল না এলে রোহিঙ্গাদের মাসিক রেশন অর্ধেকে নেমে যাবে, যা মাথাপিছু মাত্র ৬ মার্কিন ডলারে সীমাবদ্ধ থাকবে।
এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান দাতাদের সাহায্য বাড়াতে এবং নতুন দাতাদের অনুদান দিতে আহ্বান জানান তিনি।
গাজার গণহত্যা বন্ধে আহ্বান
গাজায় ইসরায়েলি হামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “শিশুরা না খেয়ে মরছে, বেসামরিক মানুষ নির্বিচারে নিহত হচ্ছে, হাসপাতাল ও স্কুল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।”
জাতিসংঘ তদন্ত কমিশনের সঙ্গে একমত হয়ে তিনি বলেন, “সবাইয়ের চোখের সামনেই গণহত্যা ঘটছে, কিন্তু মানবজাতি চুপ করে আছে। ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।”
তিনি বলেন, “পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই সংঘাতের টেকসই সমাধান সম্ভব। এখনই দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়ন করতে হবে।”
সুত্রঃ বাসস