বক্তব্য দিচ্ছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। ছবি: ডেইলি স্টার
মেলবোর্ন, ৩০ সেপ্টেম্বর- অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেছেন, পার্বত্য অঞ্চলে সহিংসতা ঘটলে সব সরকারের আচরণ এক—তারা অস্বীকার করে, দায় এড়িয়ে যায়, আর কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হয় না। কারণ, এসব ঘটনার সঙ্গে প্রায়ই স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা জড়িত থাকেন।
আজ সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে “সহিংসতার কালক্রম: রামু বৌদ্ধমন্দির হামলা থেকে ১৩ বছর এবং গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী বাংলাদেশের সহিংসতা” শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সরকারের অবস্থান সমালোচনা করে আনু মুহাম্মদ বলেন, “রামুর সময় তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন এটি জামায়াত-বিএনপির ষড়যন্ত্র, যেন যুদ্ধাপরাধের বিচার ব্যাহত হয়। এখন যখন খাগড়াছড়ি জ্বলছে, বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলছেন এটি ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’। এই অস্বীকারের ধারা একই—তারা কখনোই তদন্ত করে না, কারণ এতে তাদেরই স্থানীয় নেতারা জড়িত থাকে।”
তিনি বলেন, “সহিংসতা কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে না। এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়।”
২০১২ সালের রামু হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “বাঙালি ও মুসলমানদের স্বার্থের নামে যে সহিংসতা ঘটে, তা আসলে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উসকানি এবং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার।”
আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, “২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের বহু মামলা হয়েছিল, কিন্তু তার অল্প কয়েকটিতেই বিচার হয়েছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে আমরা উল্টো পিছিয়ে গেছি।”
পার্বত্য অঞ্চলের ভূমির মালিকানা নিয়ে স্বচ্ছতার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “সরকার যদি সত্যিই পাহাড়ে শান্তি চায়, তবে জমি কারা লিজে পেয়েছে তার তালিকা প্রকাশ করতে হবে।”
তার মতে, “সহিংসতা বন্ধ করতে প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার জন্য যাঁরা লড়েছেন, তাঁরা এমন বাংলাদেশ চাননি, যেখানে মানুষ তার পরিচয়ের কারণে আতঙ্কে থাকে।”
আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “রামু হামলার ১৩ বছর পরও বিচার শেষ হয়নি। ১৯টি মামলা হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশেরই তদন্ত শেষ হয়নি।” তিনি জানান, “স্থানীয়রা ভিডিও প্রমাণ দিয়েছিলেন যেখানে দেখা যায়, সেনা ও বিজিবি সদস্যদের পাশ কাটিয়ে হামলাকারীরা অগ্নিসংযোগ করেছে।”
তিনি বলেন, “একটি কুরিয়ার পোস্টকে কেন্দ্র করে রামুতে সহিংসতা ছড়ানো হয়েছিল। একই কৌশল পরে কুমিল্লা, রংপুর, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলায় দেখা গেছে। এই সহিংসতা কেবল সাধারণ মানুষের কাজ নয়, রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেরা তাতে সহায়তা করেন।”
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “আইনি শাস্তি মানসিক ক্ষত সারাতে পারে না। পরিচয়ের কারণে যারা আক্রান্ত হয়, তারা সমাজের প্রতি বিশ্বাস হারায়।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সমিনা লুৎফা বলেন, “রামুর ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সহিংসতার ধারা একই—এটির পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ লুকিয়ে থাকে। এখন এমন এক ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে মতের ভিন্নতাই ঘৃণার ভিত্তি হয়ে উঠছে। এটি নতুন ধরণের ফ্যাসিবাদে রূপ নিচ্ছে।”
তিনি যোগ করেন, “বাংলাদেশে সহিংসতা বুঝতে হলে রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক পুঁজিবাদী কাঠামো একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে।”
কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের সভাপতি আবদুল্লাহ আল কাফি রতন বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও দেশে কোনো সরকার গণতান্ত্রিকভাবে শাসন করেনি। আজকের সহিংসতা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদেরই রূপ। বর্তমান শাসকরা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেই ব্যস্ত, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কৃষকের ন্যায্য দাম কিংবা সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে তাদের কোনো ভাবনা নেই।”
তিনি বলেন, “আগামী আন্দোলন হবে শ্রমিক, কৃষক, সংখ্যালঘু, দলিত ও প্রান্তিক জনগণের ঐক্যের—যেখানে প্রতিষ্ঠা পাবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার।”
গায়ক ও লেখক অরূপ রাহী বলেন, “রামু থেকে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত সহিংসতার ঘটনাগুলো রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, ডানপন্থি মতাদর্শ, মিথ্যাচার ও প্রপাগান্ডার ফল।”
তার মতে, “সমাধান হলো পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি নয়, বরং গভীর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।”
আলোচনা সভাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমল্লার বসু। অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ সুজিত চৌধুরীসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
সুত্রঃ ডেইলি স্টার