মেলবোর্ন, ২ অক্টোবর: বাংলাদেশজুড়ে দুর্গাপূজার ঢাকের আওয়াজ, আলোকোজ্জ্বল মণ্ডপে দেবীর পূজা আর ভক্তদের ভিড়। বাংলাদেশের বাইরে সনাতন ধর্মালম্বীদের দুর্গাপূজা চলছে বিশ্বের নানান দেশে। সব মিলিয়ে এক অনন্য উৎসবের আবহ সনাতন ধর্মের অনুসারীদের।
শুভ বিজয়া মানেই অশুভের উপর শুভের জয়, অন্ধকারের উপর আলোর বিজয়। কিন্তু এ আনন্দের ভিড়েই লুকিয়ে আছে গভীর এক বেদনা। সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে সরব থাকা এক তরুণ সংগঠক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী এখনো কারাগারে। তাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে ভক্তদের কথায়, মানবাধিকারকর্মীদের আক্ষেপে, আর আইনজীবীদের নিঃশব্দ ভয়ে। সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় সোচ্চার এই সংগঠক শুধু উৎসবের আনন্দ থেকেই নয়, সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনে নিশ্চয়িত মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। অপরদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে, মামলাটি জটিল ও সংবেদনশীল, যার সঙ্গে আদালত এলাকা-সংঘর্ষ, এক আইনজীবীর হত্যাকাণ্ড ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ জড়িয়ে আছে।
কঠোর নিরাপত্তায় এবারের দুর্গাপূজা
অন্তর্বর্তী সরকার গর্ব করে বলছে, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। হাজার হাজার মণ্ডপে পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর নজরদারি। নিরাপত্তার আঁটোসাঁটো বলয় ঘিরে রেখেছে পূজা। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সম্প্রতি জানিয়েছেন, দুর্গাপূজাকে ঘিরে নির্দিষ্ট কোনো নিরাপত্তা হুমকি নেই। এবার দেশজুড়ে কয়েক হাজার মণ্ডপে একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে তিন ধাপের নিরাপত্তা পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়েছে পূজার আগে, চলাকালে ও বিসর্জনের সময়। ঢাকা ও অন্যান্য শহর থেকে পাওয়া প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই উৎসব নির্বিঘ্নে চলছে। তারপরও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় দুর্গাপূজার প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে যা বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা গেছে।
শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি পর্বে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুরের অনেকগুলো ঘটনাই তুচ্ছ কারণে ঘটছে বলে দাবি করেছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম।
অসুরের দাড়ি নিয়ে বিতর্ক
এবারের দুর্গাপূজায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিমায় অসুরের মুখে দাড়ি-গোঁফ আঁকাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, বিভিন্ন পূজামণ্ডপে অসুরের মুখ গামছা বা লাল কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এ নিয়ে সনাতন ধর্মের অনুসারীদের অনেকেই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। কুষ্টিয়া জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক দেবেশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘অসুরের মুখে দাড়ি-গোঁফ আঁকা শিল্পীর নিজস্ব কল্পনার বহিঃপ্রকাশ। হিন্দু শাস্ত্রে বহু ঋষি-মুনি দাড়ি রাখতেন। অসুরের মুখে দাড়ি নতুন কিছু নয়। বরং কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টিকে বিতর্কিত করেছে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্টের জন্য।’

এবারের দুর্গাপূজায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিমায় অসুরের মুখে দাড়ি-গোঁফ আঁকাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অমিতাভ দেউরি নামে এক সাংবাদিক তার ফেসবুক পোস্টে আক্ষেপ করে লেখেন, “গুরু নানক, যীশু খ্রীষ্ট, জরথ্রুষ্টীয় ঈশ্বর বা প্রজাপতি ব্রহ্মা প্রত্যেকের মুখে দাড়ি আছে।দাড়ি রাখেন হিন্দু সন্ত, ইহুদি রাব্বাই, ব্রাহ্ম ধর্ম গুরু, খ্রিস্টান যাজক, অগ্নি উপাসক পার্শি,শিখ, ঋষি, মুনি, পীর, ফকির, সুফী, বাউল, শিল্পী, কবি, মরমি সাধক। তাদের কারও কোনোদিন মনে হইলো না, হিন্দুরা অসুরটা তার দাড়িকে কটাক্ষ করে বানাইছে।” তিনি আরো লেখেন, “এই পরিস্থিতিতে কোথাও কমিটিকে “পরিস্থিতি শান্ত” রাখার নামে চাপ/ হুমকি দিয়ে এই কাজ করতে বাধ্য করেছেন। কোথাও লোকাল পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে অসুরের মুখে দাড়ি থাকলে গামছা, বা কাপড় দিয়ে নেকাবের মতো করে অসুরের মুখ ঢাকতে বাধ্য করেছেন।”
ঠাকুরগাঁও জেলায় মিঠু ঘোষ নামে এক সনাতন ধর্মালম্বী ফেসবুকে লেখেন, “১৭ নং জগন্নাথপুর ইউনিয়ন ৬নং ওয়ার্ড সিংগিয়া ঘোষ পাড়ায় প্রশাসনের আদেশে, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ রাত ১২,৪০ মিনিটে দুর্গাপূজার মূর্তি অসুরের দাড়ি উচ্ছেদ করে দিয়েছে। হিন্দুরা কি আর পূজা করতে পারবেনা ? তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিচার আঁধারে ঢাকা মানবাধিকার
ফিরে দেখা
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ২০২৪ সালের শেষ দিকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল, চট্টগ্রামে এক সমাবেশে জাতীয় পতাকা ‘অবমাননার’ ঘটনা ঘটেছে। তবে তাঁর সমর্থকদের দাবি, অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে হাইকোর্ট তাঁকে জামিন দিলে অল্প সময়ের মধ্যে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সেই জামিন স্থগিত করে। পরে আবার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হলেও শুনানির তারিখ পেছানো হয়। কয়েক মাস ধরে মামলা নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে ঘুরছে। সমর্থকদের ভাষায়, নতুন নতুন মামলা যুক্ত করে তাঁকে আটক রাখা হয়েছে। তার নিকট আত্মীয় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ওটিএন্ বাংলাকে বলেন, এখন পর্যন্ত চিন্ময়ী কৃষ্ণ দাসের মামলার সংখ্যা প্রায় ছয়টি। রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা ছাড়াও পুলিশের ওপর হামলা, কাজে বাধার, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ওপর হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আরও পাঁচটি মামলা হয়।
গত বছরের ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও মোহরা ওয়ার্ড বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খান বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে জাতীয় পতাকা অবমাননায় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ওই মামলা করেন। পরে ফিরোজ খানকে বিএনপি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ২৫ নভেম্বর ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রসঙ্গত, গত ২৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের লালদিঘী মোড়ে বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের এক সমাবেশে ভাষণ দেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভু। অভিযোগ উঠেছে, সেখানে তিনি জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছেন। এ অভিযোগে বিএনপি নেতা ফিরোজ খান ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রামে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করেন, যাতে মোট ১৯ জনকে আসামি করা হয়।
সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনে অধিকার
২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের একটি আদালত তাঁর জামিন শুনানি ২ জানুয়ারি ২০২৫-এ পেছায়। সেদিন রাষ্ট্রপক্ষ সময় চেয়েছিল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেই দিন চিন্ময়ের পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। একাধিক গণমাধ্যম সে সময় আইনজীবীর অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করে। কেউ কেউ বলেন, চট্টগ্রামে মামলা পরিচালনার জন্য স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনের অনুমোদন নিয়ে মতবিরোধ হয়েছিল। একই সময় আদালতপাড়ায় সহিংসতা ঘটে, যেখানে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ নিহত হন। এতে পুলিশ অভিযান চালায় এবং একপর্যায়ে আইনজীবীদের বর্জন কর্মসূচি শুরু হয়, যা চিন্ময়ের আইনি সহায়তাকে আরও কঠিন করে তোলে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ যে আইনজীবীদের নিজেদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং হামলার আশঙ্কায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর আইনি মামলায় লড়তে ভয়-ভীতি কাজ করছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। ধারা ৩২ অনুযায়ী, “আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।”
ধারা ৩৩(১) অনুযায়ী, “গ্রেপ্তারকৃত কোন ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেপ্তারের কারণ জ্ঞাপন না করিয়া প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তাঁহার মনোনীত আইনজীবীর সহিত পরামর্শের ও তাঁহার দ্বারা আত্মপক্ষ-সমর্থনের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না।”
ধারা ৩৩(৫) বলছে, “নিবর্তনমূলক আটকের বিধান-সংবলিত কোন আইনের অধীন প্রদত্ত আদেশ অনুযায়ী কোন ব্যক্তিকে আটক করা হইলে আদেশদানকারী কর্তৃপক্ষ তাঁহাকে যথাসম্ভব শীঘ্র আদেশদানের কারণ জ্ঞাপন করিবেন এবং উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে বক্তব্য-প্রকাশের জন্য তাঁহাকে যত সত্বর সম্ভব সুযোগদান করিবেন।”
আন্তর্জাতিকভাবে, বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদে (ICCPR) স্বাক্ষরকারী, তার ১৪ অনুচ্ছেদে ন্যায্য বিচার, আদালতে সমান সুযোগ ও নিজের পছন্দের আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
আইনজ্ঞদের মতে, কোনো পরিস্থিতিতেই অভিযুক্তের আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত করা এমনকি বর্জন বা অঘোষিত চাপের মাধ্যমে সংবিধান ও ICCPR-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আইনজীবী ও সংখ্যালঘু নেতাদের মধ্যে ভয়
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করা কয়েকজন আইনজীবী জানিয়েছেন, আদালতপাড়ার সহিংসতা ও পরবর্তী গ্রেপ্তারের ঘটনায় তাঁদের মধ্যে ভয় ও অনিচ্ছা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর মামলায় জড়ালে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা প্রতিশোধের আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোও বিভক্ত। কেউ প্রচারণা চালাতে চাইলেও অনেকেই নিরাপত্তা ও আইনি জটিলতার কারণে পিছিয়ে আছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ইসকনের একজন সদস্য ওটিএন বাংলাকে বলেন, “ইসকন চিন্ময় কৃষ্ণদাস প্রভুর ব্যাপারে সরাসরি আন্দোলনে তাদের উপর সরকারের চাপ রয়েছে।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল তথ্য
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মামলা চালাতে গয়না বিক্রি করেছেন তার মা সন্ধ্যারানী এমন একটি খবর কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওটিএন বাংলা খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে পরিবার জানায়, মামলার খরচের আর্থিক চাপ রয়েছে। বারবার শুনানি, যাতায়াত, কাগজপত্র জোগাড় সব মিলিয়ে খরচ বাড়ছে। অন্যান্য সাধারণ মামলায় যে খরচ চিন্ময় প্রভুর মামলায় সেক্ষেত্রে সব জায়গাতেই বেশি বেশি খরচ হচ্ছে বলে পরিবারের অভিযোগ।
সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সনাতন ধর্মের নেতা বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নাকি চিন্ময়ের মুক্তি চায় না। এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ তাঁর মুক্তিতে আপত্তি করতে পারে তার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। আদালত এলাকায় সংঘর্ষের পর জনশৃঙ্খলার আশঙ্কা থেকেই কেউ কেউ মনে করেন, মুক্তি পেলে আবারও উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে তাঁকে আটক রাখা অনেকের কাছে এক ধরনের বার্তা বা সতর্কবার্তা হিসেবেও কাজ করতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন আন্দোলনে না নামে। আবার কিছু বিশ্লেষকের মতে, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে অন্তবর্তী কালীন সরকার নিজেদের ‘নরম’ হিসেবে দেখাতে চায় না বলেই এমন শক্ত অবস্থান নেওয়া হতে পারে।

চট্টগ্রাম লালদিঘির সমাবেশ থেকে আট দফা দাবি জানিয়েছে সনাতন ধর্মের মানুষ সূত্র: বিবিসি বাংলা ২৬ অক্টোবর ২০২৪
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস চিন্ময় কৃষ্ণ দাস বাংলাদেশের সমস্ত হিন্দু সম্প্রদায়কে একতাবদ্ধ করতে পেরেছে এবং তার এই নেতৃত্ব দেখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভয় পেয়ে তাকে জোর করে আটক করে রেখেছে। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আটকের পূর্বে যে কয়টি মহাসমাবেশ হয় তাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটে যা ছিল অন্তবর্তী সরকারের জন্য হুমকি।
কারাগারে স্বাস্থ্য ও মানসিক অবস্থা
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা সন্ধ্যা রানী জানিয়েছেন, তিনি যেমন ছেলেকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন, তেমনই মা’কে নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন চিন্ময় প্রভুও। পরিবারের দাবি, চিন্ময়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। তিনি বলেছেন, “পূজার পর যেভাবেই হোক আমাকে বের করো।”
আইনজীবী এবং মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আটক ব্যক্তির প্রতি মানবিক আচরণ ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করা (ICCPR ধারা ১০)। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের সত্যতা যাই হোক না কেন, আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ ও সময়মতো জামিন শুনানি এগুলো কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন উভয়ই, ভয় বা ক্ষোভের সময়েও ন্যায়বিচার যেন বাস্তবে কার্যকর হয় তা নিশ্চিত করে।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির ডাক
দুর্গাপূজার ঢাকের আওয়াজে যেমন ভক্তদের হৃদয়ে আনন্দ জেগেছে, তেমনি চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর কারাবন্দিত্, সংখ্যালঘু নির্যাতন, দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিমা ভাঙচুর, দেবী দুর্গা বোধনের পর অসুরের দাড়ি নিয়ে বিতর্ক সনাতন সমাজের অন্তরে অস্থিরতা তৈরি করছে। সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সত্ত্বেও একজন সংখ্যালঘু সংগঠকের ন্যায্য বিচার ও আইনজীবীর সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হওয়া শুধু তাঁর ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, বরং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার জন্যই এক বড় চ্যালেঞ্জ। যদি নিরাপত্তা ও ভয়ের রাজনীতি মৌলিক অধিকারকে আড়াল করে দেয়, তবে “শুভ বিজয়া”র প্রকৃত অর্থই হারিয়ে যায়।
দুর্গাপূজা শেষ হবে। বিজয়ার আনন্দে মেতে উঠবে হিন্দু সম্প্রদায়। তবে এর মধ্যেই সনাতন ধর্মের অনুসারী নেতৃত্বকে ভাবতে হবে কিভাবে তারা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতে সংগঠিত হবে, আন্দোলন গড়ে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাপ সৃষ্টি করবে। কারণ তাঁর মুক্তি কেবল একজন ব্যক্তির অধিকার নয়, বরং সমগ্র সংখ্যালঘু সমাজের মর্যাদা ও বাংলাদেশের ন্যায়বিচারের ভবিষ্যতের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ওটিএন বাংলা প্রতিবেদন