জর্দানে নিখোঁজ মার্কিন সেনাকে মৃত ঘোষণা, নিহত বেড়ে ১৮
মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর জর্দানে নিখোঁজ থাকা আরও এক মার্কিন সেনাসদস্যকে মৃত বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন)। এর…
মেলবোর্ন, ২ অক্টোবর: প্রাক-কথন: ১৯৮৮ সাল। আমরা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দেশব্যাপী ভয়াবহ বন্যা। আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে আর্টস ক্যাফেটেরিয়াতে রুটি বানানোর একটি প্রকল্পে অংশ নিয়েছিলাম। এর নেতৃত্বে ছিল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। একদিন সকালে খবর এলো, তিনি আসছেন। আমরা সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম তাঁর জন্য। অবশেষে তিনি এলেন—চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, পরনে সাদাসিধে ঢাকাই শাড়ি, মুখে সেই অনাবিল হাসি।
তিনি আমাদের টেবিলে এলেন প্রায় শেষের দিকে। আমি দূর থেকে তাকিয়ে ছিলাম, হঠাৎ তিনি কাছে এসে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন: “কেমন আছো তোমরা?” মনে হলো তিনি যেন আমাকেই দেখছেন। আমি বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম। প্রথমবার তাঁকে এত কাছ থেকে দেখা। মনে হচ্ছিল, এত বড় মানুষ তিনি, অথচ তাঁর পাশে যেন কেউ নেই।
কেন এমন মনে হয়েছিল, আমি আজও জানি না। তাঁরতো জনগণ ছিল, কর্মীরা ছিল, দলের নেতারা ছিল। তবুও আমার চোখে তিনি নিঃসঙ্গ ছিলেন, এবং এখনো আছেন। মনে হচ্ছিল, তিনি একা একাই শেরপার মতো জাতিকে হিমালয়ে তুলছেন; পরেও তুলেছেন তিনি; এ নিয়ে কিছু কথা আজ বলতেই এ লেখা। কিন্তু আমার আজো মনে হয়, এডমন্ড হিলারির পাশে যেমন তেনজিং নোরকে ছিলেন, শেখ হাসিনার পাশে তেমন কেউ ছিলেননা, আজো নেই—আমার দৃষ্টিতে নেই। থাকলে ১/১১-র সময় তাঁর নিকটজনেরা তাঁকে শেষ করে দেবার ষড়যন্ত্রের অংশ হতেন না; আগষ্টের জঙ্গী উত্থানের সাথে এঁদের অনেকের যোগ থাকতোনা; তাঁরা নিজেদের দূর্নীতির মহীরূহে পরিণত করে তাঁকে ছোট করতেননা।
হ্যাঁ, জনগণই হয়তো তাঁর প্রকৃত তেনজিং নোরকে। তবুও অনেক মুহূর্তে তাকেই একা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তাঁর নির্দেশেই কঠিন পরিস্থিতিতে হাসি ফুটেছিলো মানুষের মুখে। অথচ এগুলো সহজেই অন্যরা করতে পারতো, কিন্তু করেনি। এই কারণেই আমি তাঁকে “নিঃসঙ্গ শেরপা” বলি।
আমার বিশ্বাস, বর্তমান নেতাদের মধ্যে দেশের কল্যাণের জন্য শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। তাঁর মধ্যে আছে সেই ডেসপারেট স্পিরিট, যা একটি দেশকে এগিয়ে নিতে পারে। আমি আওয়ামী লীগের কথা বলছি না, বলছি শুধু তাঁর কথা। তিনি অনেকটাই একা সিদ্ধান্ত নেন—আর এ কারণেই আমার চোখে তিনি নিঃসঙ্গ শেরপা।
শেখ হাসিনা কি তাঁর পিতাকে অতিক্রম করেছেন? প্রশ্ন কঠিন, উত্তর আরও কঠিন। বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়ে; বিশ্বরাজনীতির কারণে তাঁকে হারাতে হয়েছে। তবে তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত নেতা। শেখ হাসিনা এসেছেন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে—যেখানে স্বাধীনতার বিপরীতে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি দাঁড়িয়ে গেছে। তিনি অল্প ব্যবধানে ক্ষমতায় এসেছেন, প্রথম টার্মে করতে পারেননি অনেক কিছু, কিন্তু শিখেছেন। তারপর থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েও একজন নেতা কীভাবে ইতিহাস তৈরি করতে পারেন। এরপর তিনিও পেরে ওঠেননি; শুধুতো রাজাকাররা নয়, এখানে যোগ হলো ডিপ-স্টেট নামের আরেক কুশীলব চক্র। এদের সাথে ছিলো শেখ হাসিনার দলের ভেতরের ও বাইরের মানুষেরা।
যা হোক, আজ তাঁর জন্মদিন। কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছিলোনা লেখার; আচমকাই মনে হলো, লিখি তাঁকে নিয়ে। সেজন্যই এ আয়োজন। ধৈর্য এবং সময় থাকলে পাঠক পড়বেন লেখাটি।
শেখ হাসিনাকে কাগজেকলমে বোঝার চেষ্টা করাটাই হবে আমাদের তরফ থেকে তাঁর জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধাঞ্জলী।
বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসে শেখ হাসিনা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি ছিলেন এক জোয়ান অব আর্ক। যেমন জোয়ান অব আর্ক যিনি মধ্যযুগীয় ফ্রান্সকে দখলদারদের হাত থেকে রক্ষায় আগুনের ভেতর দাঁড়িয়ে জাতিকে পথ দেখিয়েছিলেন, তেমনি শেখ হাসিনাও ২০০১–জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত সময়ে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, হত্যাচেষ্টা, জঙ্গিবাদ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও একা দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি ছিলেন জাতির শেরপা—অসীম প্রতিকূলতার পাহাড় টপকে জাতিকে উন্নয়নের উচ্চতায় তুলেছেন। বঙ্গবন্ধুর পাশে যেমন চারজন প্রাজ্ঞ নেতা ছিলেন, শেখ হাসিনা প্রায়শই ছিলেন নিঃসঙ্গ। এই নিঃসঙ্গতাই তাঁকে করে তুলেছে আরও শক্ত, আরও অদম্য।
একটি অভিযোগ সব সময়ই শোনা যেতো তখন যে, শেখ হাসিনা হাত না দিলে কোন ছোটখাটো সিদ্ধান্তও অন্যরা নিতে পারেননা। আমি বিষয়টা নিয়ে ভেবেছি। এমনটি কেন হবে? পরে মনে হয়েছে, তিনি খুব সম্ভবতঃ তাঁর সহকর্মীদের বিশ্বাস করে উঠতে পারতেননা, এবং এ কারনে তিনি একবার নিজেই বলেছিলেন, শেখ হাসিনা ছাড়া সবাইকেই কেনা যায়। এই যে একটি কথা এটিই বলে দেয় তিনি কতটা নিঃসঙ্গ শেরপা ছিলেন; তাঁর একজন উপযুক্ত তেনজিং নোরকে ছিলেননা; হয়ত আশরাফুল ইসলাম হতে পারতেন তেমন কেউ, কিন্তু তিনি শারিরীক কারনেই সেই মাত্রায় কার্যকর ছিলেননা যতটা সৎ এবং নিবেদিতপ্রান মানুষ ছিলেন; তরুনদের মধ্যে সোহেল তাজকে তিনি ভালোবাসতেন ছোট ভাইয়ের মত, কিন্তু এই লোকটির মীরজাফর সিন্ড্রোম ছিলো সবচেয়ে বেশী, যেটি এখন পুরোপুরি প্রকাশিত।
শেষাবধি তাঁকে ওবায়দুল কাদেরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিলো। কাদের শেখ হাসিনার অধিনস্ত সহকর্মী যতটা ছিলেন ততটা তাঁর তেনজিং নোরকে ছিলেননা; শুধু কাদের নন, কেউই পারেননি। এর দোষ তাঁদের নয়, এবং শেখ হাসিনারও নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিলো ১৯৭৫ এর পরই। এখানে রাজনীতির সামরিকীকরন বা কর্তৃত্ত্ববাদী ব্যবস্থা এমনভাবে জেঁকে বসেছিলো যে, নেতার সাথে তাঁর সহকর্মীদের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায় অধীনস্তের মত; পেট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্কের প্রকাশ ঘটতে থাকে বিভৎসভাবে। তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে এটি ঘটেছে; যেসব নেতারা দেশের মঙ্গল করেছেন, উন্নয়ন করেছেন তাঁদের বেশীরভাগই নিঃসঙ্গ শেরপাই ছিলেন; তাঁদের তেনজিং নোরকে তেমন পাওয়া যায়না। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেটি ঘটেছিলো বলে আমার ধারনা।
যাই হোক, আজ আলোচনাটি আমি সাজয়েছি শেরপা হিসেবে অর্থনীতির বাইরে সামাজিক সেক্টরে শেখ হাসিনার মূল অবদানগুলো নিয়ে। শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে তাঁর পক্ষ-বিপক্ষ উভয় ক্যাম্পই মূল আলোচনাগুলো করেছে অর্থনৈতিক দূর্নীতি ও কর্তৃত্ত্ববাদী শাসন নিয়ে। সামাজিক খাতে তাঁর যে অবদান সেগুলো নিয়ে তেমন প্রামানিক আলোচনা হয়নি। আজকের প্রবন্ধে আমরা মূলতঃ শেখ হাসিনার সময়কালের কয়েকটি সামাজিক উন্নয়নের পরিমাপক নিয়ে আলোচনা করবো; এর সাথে মানুষের সামাজিক জীবনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় সেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিমাপক নিয়েও আলাপ করবো; সব শেষে তাঁর সময়কালের দূর্নীতি বিষয়ক পরিমাপক নিয়েও একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হবে আজকের এ প্রবন্ধে।
সামাজিক উন্নয়ন ও লিঙ্গ বৈষম্য
এগুলোর মধ্যে মানবোন্নয়ন সূচক এবং নারী বিষয়ক মৌলিক দুটো পরিমাপক দিয়ে আলোচনাটি শুরু করা যাক।
নীচের লেখচিত্রে ২০০৫-২০২৩ পর্যন্ত উপাত্ত পরিবেশন করে ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করা হয়েছে তিনটি পরিমাপকের; এগুলো হলো, মানবোন্নয়ন সূচক (Human Development Index, or HDI), লিঙ্গ ভিত্তিক উন্নয়ন সূচক (Gender Development Index, or GDI), এবং লিঙ্গ বৈষম্য বিষয়ক পরিমাপক (Gender Inequality Index, or GII)। বলে নেয়া দরকার, HDI এর জন্য আমরা ২০০৫-২০২৩ পর্যন্ত উপাত্ত নিয়েছি; GDI এবং GII এর জন্য নতুন পরিমাপক ব্যবহার শুরু হয় ২০১৫ সালে।

লেখচিত্রে ২০০৫-২০২৩ পর্যন্ত উপাত্ত পরিবেশন করে ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করা হয়েছে তিনটি পরিমাপকের; এগুলো হলো, মানবোন্নয়ন সূচক (Human Development Index, or HDI), লিঙ্গ ভিত্তিক উন্নয়ন সূচক (Gender Development Index, or GDI), এবং লিঙ্গ বৈষম্য বিষয়ক পরিমাপক (Gender Inequality Index, or GII)।
সূচকের অগ্রগতি ও শেখ হাসিনার নেতৃত্ব
ওপরের লেখচিত্রে যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, তা মূলত শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বের কৃতিত্ব। মনে রাখা দরকার, তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে সামাজিক উন্নয়নে নের্তৃত্ত্বদানকারী মানুষেরা আসলে নিঃসঙ্গ শেরপাই হন; শেখ হাসিনা এর ব্যতিক্রম ছিলেননা। পদ্মা সেতুর বিষয়েও আমরা জানি, শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে কিভাবে এটি বাস্তবের মুখ দেখেছিলো।
মানব উন্নয়ন সূচক (HDI): ২০০৫ সালে মাত্র 0.৫২৫ থেকে ২০২৩ সালে 0.৬৮৫-এ উন্নীত হওয়া—এটি নিছক কোনো প্রশাসনিক নিয়মকানুনের ফল নয়, বরং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দৃঢ়তা ও ভিশনের ফল। তিনি শিক্ষা বিস্তার, কমিউনিটি ক্লিনিক, ও সামাজিক সুরক্ষা নীতিগুলো নিজস্ব রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টিতে চালু করেন। তুলনা করলে দেখা যায়, ২০০১–২০০৮ এ বিএনপি ও সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকারের আমলে অগ্রগতি ছিল ধীর, কিন্তু শেখ হাসিনার সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয়—তিনটি মূল সূচকেই সুষম উন্নয়ন হয়েছে।
এই ব্যপারটি অমর্ত্য সেনের “Capability Approach” দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, HDI শুধু আয়ের পরিমাপ নয়, বরং মানুষের “ক্ষমতায়ন” (health, education, decent living) বোঝায়। শেখ হাসিনা এই তিনটি ক্ষেত্রেই জোর দিয়েছিলেন—স্কুলে মেয়েদের ফ্রি শিক্ষা, ১০ টাকা কেজি চাল কর্মসূচি, এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ।
লিঙ্গভিত্তিক উন্নয়ন সূচক (GDI): ২০১৫–২০২৩ সময়ে নারীর ক্ষমতায়ন অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, এবং নেতৃত্বে প্রবেশের সুযোগগুলো শেখ হাসিনার একক নীতিগত সিদ্ধান্তে এসেছে। ২০১৫ সালে এই পরিমাপকে বাংলাদেশের স্কোর ছিলো ০.৮৯; এটিও ২০০৯ থেকে শেখ হাসিনা সরকারের নারীবান্ধব পলিসির প্রভাবেই ঘটেছিলো। যেটি সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য তা হলো, ২০২৩ সালে এটি বেড়ে ০.৯১ এ পৌঁছোয়। মেয়েদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ভর্তি হার ছেলেদের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। মাতৃমৃত্যু হার ২০০১ সালে প্রতি ১০০,০০০ জনে ৩২০ থেকে কমে ২০২৩ সালে ১৩৬-এ নেমে আসে। নারীর জীবন প্রত্যাশা পুরুষের চেয়ে বেশি (৭৪ বছর বনাম ৭১ বছর)। GDI তে বাংলাদেশ ধারাবাহিক উন্নতি করে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম অগ্রগামী দেশ হয়ে ওঠে। অমর্ত্য সেন বাংলাদেশকে ভারতের চেয়ে অগ্রগামী বলে দেশটির ভূয়সী প্রশংসা করেন।
Beijing Platform for Action (১৯৯৫) এবং GDI কাঠামো অনুসারে, লিঙ্গ সমতার উন্নয়ন রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে সম্ভব হয়। শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে প্রথাগত পিতৃতান্ত্রিক সমাজেও দ্রুত পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এসব উন্নতিতে দলের অন্য নের্তৃত্ত্বের তরফ থেকে তেমন কোন বিশেষ কোন অবদানের কথা জানা যায়না।
লিঙ্গ বৈষম্য সূচক (GII): ২০০১–২০০৬ এ নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ছিল সীমিত (প্রধানত সংরক্ষিত আসনে)। শেখ হাসিনার আমলে নারীরা সচিবালয়, বিচার বিভাগ, সেনাবাহিনী, পুলিশ, কূটনীতি—সবক্ষেত্রে নেতৃত্বে উঠে আসেন। স্থানীয় সরকার (UP, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন)-এ নারীর সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব দৃশ্যমান হয়। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলের নেতা, সংসদ উপনেতা—চার শীর্ষ পদে নারী নেতৃত্ব দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশেই ছিলো।
২০১৫ সালে ০.৫২০ থেকে ২০২৩ সালে কমে গিয়ে ০.৪৮৭-এ নেমে আসা এই সূচক দেখায়, বৈষম্য কমেছে মূলত তাঁর নীতিগত অবস্থানের কারণে—নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও স্বাস্থ্য অধিকারকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্ত করেছেন তিনিই। Nancy Fraser-এর “Redistribution and Recognition” থিসিস অনুযায়ী, সমতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক–রাজনৈতিক স্বীকৃতির বিষয়। শেখ হাসিনা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে সাংবিধানিক কাঠামো ও নীতি উভয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন।
GDI এবং GII এর এমন অভাবনীয় উন্নতি আসলে নের্তৃত্ত্বের সুদূরপ্রসারী নারীবান্ধব চিন্তা-চেতনার ফসল।
ওপরের তিনটি সূচকের অগ্রগতি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কৃতিত্বের প্রতীক। তিনি ছিলেন এক নিঃসঙ্গ শেরপা—যিনি চারপাশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ সহায়তা না পেয়েও জাতিকে উন্নয়নের শিখরে তুলেছেন। আবার বাংলাদেশের মত একটি রক্ষনশীল দেশে একজন মানুষকে নের্তৃত্ত্বের জায়গায় নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করতে গেলে অবশ্যই নিঃসঙ্গ হতে হয়।
অপরাধের হার – তুলনামূলক বিশ্লেষণ
নীচের গ্রাফটিতে ২০০১-২০২৫ পর্যন্ত আইনশৃংখলা প রিস্থিতির চিত্র দেখানো হল। দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনার সময়ে খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, ডাকাতি ও চুরির হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বিএনপি এবং সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকারের আমলে এগুলো ছিল উচ্চ এবং অন্তর্বর্তী শাসনে আবার বেড়েছে।

গ্রাফটিতে ২০০১-২০২৫ পর্যন্ত আইনশৃংখলা পরিস্থিতির চিত্র দেখা যাচ্ছে
এই গ্রাফে দেখা যাচ্ছে—
ওপরের আলোচনা স্পষ্ট করে প্রমাণ করে যে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শেখ হাসিনা ছিলেন বাংলাদেশের Law & Order Architect। তাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ আবারও অপরাধ ও বিশৃঙ্খলার উর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরে গেছে।
দূর্নীতির চিত্রঃ শেখ হাসিনার আমল কি দূর্নীতিতে সবার সেরা ছিলো?
নীচের গ্রাফে টিআইবি’র পারসেপশান ইন্ডেক্সের একটি তুলনামূল চিত্র দেয়া গেলো। এর সাথে ২০২৫-৩০ পর্যন্ত পুর্বাভাষ দেয়া হয়েছে এই পরিমাপকের। বিএনপি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, ও আওয়ামী লীগের পারফর্মেন্সের ভিত্তিতে দেখানো হয়েছে কী হতে পারে এটিতে যদি এই তিন সরকার ক্ষমতায় থাকে।

গ্রাফে টিআইবি’র পারসেপশান ইন্ডেক্সের একটি তুলনামূল চিত্র
বিশ্লেষণ: দুর্নীতি ধারণা সূচক (CPI), ২০০১–২০৩০
১. বিএনপি আমল (২০০১–২০০৬):
২. আওয়ামী লীগ আমল (২০০৯–২০২৪):
৩. পূর্বাভাস ২০২৫–২০৩০ (Forecast):
দূর্নীতি সম্পর্কে যা বোঝা গেলোঃ
নীচে আরেকটি লেখচিত্র দেয়া গেলো। এখানে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের Bribery Incidence বিষয়ক সূচক, Global Financial Integrity এবং UNODC নামক সংস্থার Illicit Financial Flow (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং ইত্যাদি), BASEL/AML (অর্থ পাচারের প্রবণতা) এগুলোর ভিত্তিতে একটি পূর্বাভাসমূলক চিত্র দেয়া হলো।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের Bribery Incidence বিষয়ক সূচক, Global Financial Integrity এবং UNODC নামক সংস্থার Illicit Financial Flow (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং ইত্যাদি), BASEL/AML (অর্থ পাচারের প্রবণতা) এগুলোর ভিত্তিতে একটি পূর্বাভাসমূলক চিত্র
বিশ্লেষণ: ২০২৫–২০৩০ পূর্বাভাসে দুর্নীতি প্রবণতা
১. আওয়ামী লীগ (AL):
২. বিএনপি (BNP):
৩. ইন্টারিম সরকার (2024–2030):
এ বিষয়ে সারসংক্ষেপঃ
এই বিশ্লেষণ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও দুর্নীতিনিয়ন্ত্রণমুখী নেতৃত্ব হলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ।
সবশেষে আমরা শেষ গুরুত্ত্বপূর্ন একটি পরিমাপক ব্যবহার করতে চাই। Basel AML Index টি দুটো জিনিস পরিমাপ করে: অর্থ পাচার (Money Laundering বা ML)) ও জংগী অর্থায়ন (Terrorist Financing বা TF) ঝুঁকি। অর্থাৎ, একটি দেশে অবৈধ অর্থ সঞ্চালন, পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা—এসব কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে, সেটাই Basel AML Index দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
স্কোরের ব্যাখ্যা:
সূচকের উৎস/উপাদান
Basel AML Index তৈরি হয় প্রায় ১৮টি ভিন্ন উৎস (World Bank, FATF, Transparency International, WEF ইত্যাদি) থেকে, যেখানে বিবেচনা করা হয়:
অতএব, এখানে “ঝুঁকি” বলতে বোঝানো হচ্ছে অর্থপাচার ও দুর্নীতির ঝুঁকি, আয় বা অর্থনৈতিক গ্রোথের ঝুঁকি নয়।

Basel AML Index Risk Score (বাংলাদেশ, 2001–2025)
বিশ্লেষণ: Basel AML Index Risk Score (বাংলাদেশ, 2001–2025)
BNP আমল (2001–2006, পূর্বাভাসমূলক):
গ্রাফে নীল লাইনটি BNP সময়কালকে বোঝায়। যেহেতু Basel AML Index-এর অফিসিয়াল ডেটা 2012 থেকে পাওয়া যায়, তাই এখানে BNP আমলের মানগুলো ধারণাভিত্তিক পূর্বাভাস (illustrative forecast) হিসেবে যোগ করা হয়েছে।
এই সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, এবং আন্তর্জাতিক রেটিং-এ “সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত” দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া বাস্তবতা ছিল। ফলে অনুমান করা যৌক্তিক যে, Basel AML সূচকে ঝুঁকি স্কোর তখন 7.0–8.5 এর মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে ছিল।
এটি প্রমাণ করে BNP আমলে অর্থ পাচার, ঘুষ, অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল AML/CFT কাঠামো ছিল সর্বোচ্চ মাত্রায়।
আওয়ামী লীগ আমল (2012–2024, অফিসিয়াল ডেটা):
2012 সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল 6.28, যা ধাপে ধাপে নেমে 2024 সালে দাঁড়িয়েছে 5.62।
এই প্রবণতা দেখায় যে AL আমলে Basel AML Index-এর ঝুঁকি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে গেছে—মানে, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন রোধের ক্ষমতা তুলনামূলক শক্তিশালী হয়েছে।
যদিও স্কোরে ওঠানামা আছে (2015–2016-এ কিছুটা উচ্চ মান, 2020–2021 এ উন্নতি, এবং 2022–2024-এ সামান্য অবনতি), সামগ্রিকভাবে AL শাসনকালকে বলা যায় “reform-driven improvement period।”
ইন্টারিম সরকার (2025, পূর্বাভাসমূলক):
2024-এর 5.62 থেকে 2025-এ অনুমানভিত্তিক স্কোর 6.20-এ বেড়ে গেছে, যা ঝুঁকির অবনতি নির্দেশ করে।
এর মানে, অগাস্ট 2024-এ ইন্টারিম সরকার ক্ষমতায় আসার পর AML/CFT ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক বৈধতার সংকট, প্রশাসনের অদক্ষতা, এবং জবাবদিহিতার অভাবকে এ প্রবণতা প্রতিফলিত করে।
সংক্ষেপে দূর্নীতির ঝুঁকি বিশ্লেষনে যা দেখা গেলো তা হলোঃ
তাই গ্রাফটি দেখায়—দুর্নীতির ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নতি হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ আমলে; আর সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল BNP ও বর্তমানে ইন্টারিম সরকারের অধীনে।
সুতরাং, গ্রাফ ও ডেটা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়—বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসনের ধারাবাহিক উন্নতি একমাত্র শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সম্ভব ছিল। তাঁর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র আবারও দুর্নীতির অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে।
জোয়ান অব আর্ক এবং পথচলার নিঃসঙ্গ শেরপা
যেসব উপাত্ত নিয়ে আলোচনা করা হলো তার ভিত্তিতে শেখ হাসিনার সাথে জোয়ান অব আর্কের মিল খুঁজে পাই আমি। বারবার মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েছেন এই মানুষটি; কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি থেকেও জাতিকে রক্ষা করেছেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, অন্তত উনিশ বার তাঁকে হত্যাচেষ্টা, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, সবশেষ চব্বিশের ৫ আগষ্ট তাঁকে শেষ করে দেয়ার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র—এসবের ভেতর দিয়েও তিনি হাল ছাড়েননি। তিনি শুধু টিকে থাকেননি, বরং দেশকে এগিয়ে নিয়েছেন। জোয়ান অব আর্ক যেমন নারী হয়েও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সামরিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, শেখ হাসিনাও তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার পুরুষনির্ভর রাজনীতিতে নারী ও প্রান্তিক মানুষের শক্তি ও সক্ষমতার প্রতীক।
তাঁকে “নিঃসঙ্গ শেরপা” বলা যায় কারণ উন্নয়নের পথে তাঁর পাশে বঙ্গবন্ধুর মতো শক্তিশালী উপদেষ্টামণ্ডলী ছিল না। পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ, জঙ্গিবাদ দমন অভিযান, কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান—এসব ক্ষেত্রেই তাঁকে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। একদিকে তিনি জাতিকে উন্নয়নের শিখরে তুলেছেন, কিন্তু অন্যদিকে তিনি প্রায়শই ছিলেন একা, সহযোগী নেতৃত্বের অভাবে নিঃসঙ্গ; এমনকি আজ যখন আওয়ামী লীগ বিপদে, তিনি নিজে বিপদে, তখনো তিনি নিঃসঙ্গ, অথচ নের্তৃত্ত্ব তাঁকেই দিতে হচ্ছে এখনো; আওয়ামী লীগের পুরো আমলে এবং শেষে যত রকমের অনাচার হয়েছে তার সবই শেষাবধি তাঁর কাঁধেই পড়েছে; তাঁর পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়ার মত কেউ নেই। এটি শেখ হাসিনার নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের কারনেও হতে পারে। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা যাবে।
মোটামুটি বলা চলে, দুইটি প্রতীক—Joan of Arc (সাহসী যোদ্ধা নারী) এবং Lonely Sherpa (এককভাবে বোঝা বহনকারী পথপ্রদর্শক)—শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সারাংশকে ধারণ করে।
২০০১–২০২৫ সময় প্রমাণ করে—শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জোয়ান অব আর্ক। তিনি হত্যাচেষ্টা, ষড়যন্ত্র, আন্তর্জাতিক চাপ—সবকিছুর ভেতর দিয়েও জাতিকে এগিয়ে নিয়েছেন। তিনি ছিলেন শেরপা, একা পথপ্রদর্শক; তিনি ছিলেন নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক; তিনি ছিলেন স্বাধীনতার রক্ষক। জোয়ান অব আর্ক যেমন ইতিহাসে অমর, শেখ হাসিনাও তেমনি ইতিহাসে অমর থাকবেন—বাংলাদেশের জোয়ান অব আর্ক এবং নিঃসঙ্গ শেরপা হয়ে।

লেখক: ডঃ শ্যামল দাস, প্রফেসর, হোমল্যান্ড সিকিওরিটি ও সমাজবিজ্ঞান, এলিজাবেথ সিটি স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ক্যারোলাইনা, ইউএসএ
United Nations Development Programme. (2025). Human Development Report 2025: Statistical Annex – Table 1 (HDI & components). Retrieved from https://hdr.undp.org
UNDP Data Futures Exchange. Bangladesh country page. Retrieved from https://hdr.undp.org
UNDP. (2025). HDI Trends 1990–2023 (Comparable Series). Retrieved from https://hdr.undp.org
UNDP. (2025). Gender Development Index (GDI) – Statistical Annex (Table 4). Retrieved from https://hdr.undp.org
UNDP. (2025). Gender Inequality Index (GII) – Statistical Annex (Table 5). Retrieved from https://hdr.undp.org
UNDP. (2025). Human Development Data Center – Technical notes & methodology. Retrieved from https://hdr.undp.org
Transparency International. (2024). Corruption Perceptions Index (CPI) 2023. Retrieved from https://www.transparency.org/en/cpi
Transparency International. (2024). Bangladesh country page (CPI 2024). Retrieved from https://www.transparency.org
Basel Institute on Governance. (2024). Basel AML Index – 13th Public Edition. Basel, Switzerland. Retrieved from https://index.baselgovernance.org
Basel Institute on Governance. (2012–2023). Basel AML Index Archive Reports. Retrieved from https://index.baselgovernance.org
United Nations Office on Drugs and Crime (UNODC). Global Study on Homicide. Retrieved from https://dataunodc.un.org
World Bank. Intentional homicides (per 100,000 people) – Bangladesh (Indicator SH.STA.HOMI.P5). Retrieved from https://data.worldbank.org
World Bank. (2022). Enterprise Surveys – Bribery incidence (% of firms experiencing at least one bribe request). Retrieved from https://www.enterprisesurveys.org
Global Financial Integrity (GFI). (2019). Illicit Financial Flows to and from Developing Countries: 2006–2015. Washington, DC: GFI.
Global Financial Integrity (GFI). (2020). Trade-Related Illicit Financial Flows in 134 Developing Countries 2008–2017. Washington, DC: GFI.
Global Financial Integrity (GFI). (2021). Illicit Financial Flows: Methodology Update. Washington, DC: GFI.
The Daily Star. (2025). Bangladesh’s latest HDI takeaways. Dhaka.
Prothom Alo. (2025). Bangladesh CPI 2024 coverage. Dhaka.
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au