ধর্ষণবিরোধী অবরোধকে কেন্দ্র করে দুপুরের দিকে পাহাড়ি ও বাঙালি দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ অক্টোবর- পার্বত্য অঞ্চলে সাম্প্রতিক সহিংসতার পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব। পাহাড়ে ঘটে যাওয়া অধিকাংশ সংঘাতের সূচনা হয় এসব গুজব থেকেই—যা দ্রুত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি ও উত্তেজনার জন্ম দেয়। নাগরিক সমাজের দাবি, গুজব প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।
সম্প্রতি খাগড়াছড়িতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সেই উত্তেজনার মাঝেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উস্কানিমূলক পোস্ট। এর পরপরই পাহাড়ি ও বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে মুখোমুখি সংঘাত শুরু হয়, যা গুইমারার রামসু বাজারে ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয় এবং তিনজনের প্রাণহানি ঘটে।
বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ির ওই ঘটনায় অন্তত ২০টিরও বেশি গুজব ছড়ানো হয়েছিল পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় পক্ষ থেকেই। এমনকি ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ভারতসহ বিশ্বের নানা জায়গার পুরোনো সংঘাতের ভিডিও ও ছবি “খাগড়াছড়ির ঘটনা” হিসেবে প্রচার করা হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
শুধু এই ঘটনা নয়, গত কয়েক বছরে পাহাড়ে সংঘটিত সহিংসতার প্রায় ৮০ শতাংশের পেছনেই ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো মিথ্যা খবর ও গুজব। একটি ছোট ঘটনাও এসব গুজবের কারণে বড় সংঘাতে রূপ নেয়। নাগরিক সমাজের মতে, এসব গুজব ছড়ায় কিছু স্বার্থান্বেষী তৃতীয় পক্ষ, কিন্তু না ভেবে তা শেয়ার করে অনেকে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম।
বান্দরবান জেলা সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি অংচ মং মারমা বলেন, “ছোট গুজব থেকেই বড় ঘটনা ঘটে। তাই গুজবে কান না দেয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
এনজিও কর্মী নুকু চাকমা বলেন, “তরুণরা এখন সবচেয়ে বেশি সক্রিয় অনলাইনে। কোনো খবর দেখলেই যাচাই না করে শেয়ার করে ফেলে এই প্রবণতাই বিপজ্জনক।”
নাগরিক সমাজের সদস্যরা বলছেন, গুজব প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে এবং স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনের নেতা মোশারফ হোসেন বলেন, “ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে মানুষ সচেতন হলে, এসব গুজবের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।”
রাঙ্গামাটি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন বলেন, “যখনই কোনো গুজব ছড়ানোর ঘটনা ঘটে, তখনই আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেই, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা গুজব ছড়ায় তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে পাহাড়ে আরও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়ে যাবে।
সুত্রঃ দৈনিক সমকাল