মেলবোর্ন ২১ অক্টোবর- বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পদক্ষেপ নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কূটনৈতিক মহলে অনেকে মনে করছেন, ইসলামাবাদের প্রতি ঢাকার ক্রমবর্ধমান ঝোঁক বাংলাদেশের স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কের পর সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় একাধিক বৈঠক ও আলোচনা আয়োজন করেছে, যেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি বলেছেন,
“আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছি, কিন্তু কারও পক্ষে যাচ্ছি না এটা আমাদের স্বার্থেই করা হচ্ছে।”
তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই সম্পর্ক ‘স্বাভাবিকীকরণ’-এর চেয়ে বেশি এটি এক ধরনের নির্ভরতামূলক প্রবণতা তৈরি করছে।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে দুই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ও নীতি এক নয়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লে বাংলাদেশের জন্য কিছু অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে বটে, তবে এতে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক ও দক্ষিণ এশীয় ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এক বিশ্লেষণে বলেন,
“পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ভুল নয়, কিন্তু একপক্ষীয় নির্ভরতা বা রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে পড়লে তা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।”
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এখনো বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনমনে জীবন্ত। সেই ইতিহাসের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার প্রচেষ্টা অনেকের কাছে বিতর্কিত।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত ১৯৭১ সালের গণহত্যার আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি বা ক্ষমা না চাওয়া “নৈতিক অস্বস্তির” জায়গা তৈরি করেছে।
অনেক কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বাংলাদেশের উচিত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা যাতে কোনো দেশ বা শক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা না বাড়ে।
তাদের মতে, দেশের পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত বহুমাত্রিক দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ সবার সঙ্গে সমান সম্পর্ক রক্ষা করা।
জনমতের একাংশ মনে করে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে, তবে ইতিহাস ও জাতীয় স্বার্থ ভুলে গেলে তা বিপজ্জনক হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে যেখানে বিদেশনীতি “ভারসাম্য ও স্বার্থনির্ভর” হওয়া দরকার, “অনুভূতিনির্ভর” নয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা একদিকে কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে ইতিবাচক হতে পারে, অন্যদিকে ইতিহাস ও নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশকে এখন এমন একটি কৌশল নিতে হবে, যাতে বিদেশনীতি স্বাধীন, বাস্তবসম্মত ও বহুমুখী থাকে কোনও এক দেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়।