ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি আহ্বান: মানবাধিকার সুরক্ষা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি। (ছবি: বিডি ডাইজেস্ট)
মেলবোর্ন, ২১ অক্টোবর: ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা যৌথভাবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্দেশে এক খোলাচিঠি প্রকাশ করেছে। এতে তারা সরকারের প্রতি ১২ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
চিঠিটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। এতে জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, নিরাপত্তা খাতে সংস্কার, গুম তদন্ত কমিশন শক্তিশালীকরণ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পুনর্গঠন, ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায় আইন সংস্কার, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও নজরদারি সীমিতকরণ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার, এনজিও স্বাধীনতা রক্ষা, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গে সহযোগিতার মতো ১২টি অগ্রাধিকারমূলক সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে সিভিকাস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), ফর্টিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট এফ. কেনেডি হিউম্যান রাইটস, এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট।
নির্বাচনের আগে মানবাধিকার সুরক্ষায় জোর দাবি
চিঠিতে বলা হয়েছে, “২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সংক্ষিপ্ত এই অন্তর্বর্তী সময়ে আমরা আপনাকে আহ্বান জানাই মানবাধিকার সুরক্ষা আরও বিস্তৃত করতে এবং এমন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে, যা বাংলাদেশে স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করবে এবং ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসনের ঝুঁকি প্রতিহত করবে।”
সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, নিরাপত্তা খাতে কাঠামোগত সংস্কার এখনো সম্পূর্ণ হয়নি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য জবাবদিহিতা প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছে না।
রাজনৈতিক মামলা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে উদ্বেগ
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে,
“চলমান নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক, বিশেষত আওয়ামী লীগ সম্পর্কিত এমন সব মামলা যেগুলোর যথাযথ প্রমাণ নেই বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।”
রোহিঙ্গা ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংস্থাগুলো ড. ইউনূসের জাতিসংঘ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায়, “আপনি বলেছিলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধান প্রত্যাবাসন, এবং নতুন আগত শরণার্থীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু বর্তমানে মিয়ানমারে কোনো নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নেই, বিশেষত ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে আগত প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গাসহ কারও জন্যই।”
মানবাধিকার সুরক্ষায় ১২ দফা প্রস্তাব
চিঠির শেষাংশে বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় নিম্নলিখিত ১২ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়:
১। জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কর্তৃক সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীকে আদালতের প্রতি পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে এবং মৃত্যুদণ্ডে স্থগিতাদেশ ঘোষণা করতে হবে।
২। নিরাপত্তা খাতে সংস্কার: র্যাব বিলুপ্তি ও ডিজিএফআইয়ের ক্ষমতা সীমিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে মানবাধিকারসম্মত নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩। গুম তদন্ত কমিশন শক্তিশালীকরণ: গুমকে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে ঘোষণা ও সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ দ্রুত পাসের আহ্বান জানানো হয়েছে।
৪। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার: প্যারিস প্রিন্সিপলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কমিশনকে স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
৫। ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায় আইন সংস্কার: সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশসহ সব দমনমূলক আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মান অনুযায়ী সংশোধন বা বাতিলের আহ্বান।
৬। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা: নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষায় ‘পারসোনাল ডাটা প্রোটেকশন’ ও ‘ন্যাশনাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট’ অধ্যাদেশ সংশোধনের সুপারিশ।
৭। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক সুরক্ষা: সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের আহ্বান।
৮। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার: আগস্ট ২০২৪-এর আগে ও পরে দায়ের করা রাজনৈতিক মামলা পর্যালোচনা করে বাতিল করার দাবি।
৯। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, “গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বার্থে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।”
১০। সিভিল সোসাইটি ও এনজিও স্বাধীনতা: এনজিও ব্যুরো সংস্কারের মাধ্যমে নাগরিক সংগঠনগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
১১️। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা: জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন বন্ধ, চলাচল ও জীবিকার ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার আহ্বান।
১২️।আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সঙ্গে সহযোগিতা: বাংলাদেশ-মিয়ানমার পরিস্থিতিতে আইসিসির চলমান তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা ও ওয়ারেন্টভুক্ত অভিযুক্তদের হস্তান্তরের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই যৌথ চিঠিটি বাংলাদেশের মানবাধিকার পুনর্গঠন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চিঠি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।