বাংলাদেশ

মতামত

আজ বাঁধন, কাল কে?: নারীদেহ, ক্ষমতাহীনের প্রতিরোধ, রাজনীতি ও মব সংস্কৃতির বুমেরাং

প্রফেসর ডঃ শ্যামল দাস, ভার্জিনিয়া। ইউএসএ

  • 3:04 pm - September 09, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৩ বার
ইতালিতে হামলা ও হেনস্তার শিকার অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন—আজ বাঁধন, কাল কে? নারীদেহ, ক্ষমতাহীনের প্রতিরোধ, রাজনীতি ও মব সংস্কৃতির বুমেরাং। ছবি: ওটিএন বাংলা

ভার্জিনিয়া: আজ সকালে আমার এক বন্ধু বললেন, “দাদা, কিছু কইলেন না যে”! আমি বুঝেও বললাম, “কী বিষয়ে”? তিনি যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। আমাকে বললেন, “ও আপনেতো আবার সুশীল! এই বদ বাঁধনকে যে উত্তমমধ‍্যম দেয়া অইলে তাতে আপনার বহুত দুঃখ অইতে আছে” (বলেছিলেন আরো খারাপভাবে)। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার কী মত?” তিনি তীব্র উত্তেজিত গলায় বললেন, “এরা কোন মানুষ অইলে? যেইভাবে পাঁচ তারিখের (পাঁচ’ই আগষ্ট ২০২৪) পর থেইকা আমরার কর্মীদের, নারীদের মব করতে আছে তার কোন প্রতিবাদ এই মহিলা করছিলেন কুনো সুমায়”? আমি তাঁকে আমার মতামত জানালাম; খুবই স্বাভাবিক যে, তিনি মোটেই খুশী হননি। সেসময়ই ভাবলাম, এ নিয়ে আমার ভাবনাটি বন্ধুদের জানাবো। সেই চিন্তারই প্রতিফলন আজকের লেখা।

প্রথমেই একটা জিনিস বলে নেয়া দরকার যে, ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে ঘিরে যে হামলা ও হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে, তার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানাই। একজন শিল্পী বা যেকোন মানুষ কোন রাজনৈতিক বিশ্বাস ধারণ করেন, কোন আন্দোলনে তাঁর কী ভূমিকা ছিল কিংবা তিনি কার সমর্থক বা সমালোচক, তার কোনোটিই তাঁকে আক্রমণ, ঘেরাও, অপমান বা ভীত করার অধিকার কাউকে দেয় না। সভ্য সমাজে বক্তব্যের জবাব বক্তব্য দিয়ে, যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দিতে হয়। মুষ্টি, হুমকি ও দলবদ্ধ অপমান দিয়ে নয়।

কিন্তু বিষয়টি কি এত সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? আমার মনে হয়, যায়না। শুধু বাঁধনের ঘটনাটির নিন্দা জানিয়ে থেমে গেলে আমরা সমস্যার ওপরের অংশটুকুই দেখব, শিকড়টি দেখতে পাব না। যে মব আজ বাঁধনের দরজায় পৌঁছেছে, সেটি এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। প্রতিপক্ষকে অপমান, ঘেরাও, সামাজিকভাবে একঘরে করা এবং বিশেষত একজন নারীকে তাঁর শরীর, পোশাক, সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে আক্রমণ করার যে সংস্কৃতি আমরা কখনো সমর্থন করেছি, কখনো উপভোগ করেছি এবং কখনো নীরবে পাশ কাটিয়ে গেছি, আজ তারই বুমেরাং ফিরে আসছে।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা আমরা দেখেছি পাঁচই আগস্টের পর গণভবনে। শেখ হাসিনার সরকার, তাঁর শাসনপদ্ধতি, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কঠোরতম সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। একজন ক্ষমতাসীন ব্যক্তি নারী বলে তিনি রাজনৈতিক জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকবেন, এমন কথা কেউ বলছে না। কিন্তু তাঁর শাসনের সমালোচনা এবং তাঁর নারীসত্ত্বাকে অপমান করা এক বিষয় নয়।

গণভবনে প্রবেশের পর শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত পোশাক, বিশেষত অন্তর্বাস হাতে নিয়ে প্রদর্শন ও উল্লাস করার যেসব দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছিল, সেগুলো নিছক ক্ষমতাচ্যুত একজন শাসকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ক্ষোভের প্রকাশ ছিল না। সেখানে একজন ক্ষমতাবান নারীকে তাঁর শরীরে নামিয়ে আনার পুরুষতান্ত্রিক আনন্দও ছিল। একজন পুরুষ শাসকের পতনের পর তাঁর নীতির প্রতীক ভাঙা হতে পারে; কিন্তু একজন নারী শাসকের পতনে তাঁর শয়নকক্ষ, পোশাক ও অন্তর্বাস কেন রাজনৈতিক বিজয়ের স্মারক হয়ে ওঠে? প্রশ্নটি এখানেই।

এই প্রবণতার আরেকটি দৃষ্টান্ত শরীফ ওসমান হাদিকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ভাষা ও পরবর্তী বীরায়নের মধ্যে দেখা যায়। তাঁর হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে নৃশংস, অন্যায় এবং নিন্দনীয়। কোনো মানুষের রাজনৈতিক বক্তব্য বা অতীত ভূমিকা তাঁকে হত্যা করার বৈধতা দেয় না। তাঁর হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু একটি হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করা এবং নিহত ব্যক্তির জীবদ্দশায় উচ্চারিত প্রতিটি বক্তব্যকে নৈতিক অনুমোদন দেওয়া এক বিষয় নয়।

হাদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে কোনো কোনো নারীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, যৌনতা ও কথিত “যৌন পবিত্রতা” নিয়ে যে ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, তা সুস্থ রাজনৈতিক সমালোচনার সীমা অতিক্রম করেছিল। একজন নারীর রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব তাঁর নীতি বা যুক্তি দিয়ে না দিয়ে যদি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক বা যৌন চরিত্র নিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি রাজনৈতিক সাহস নয়; সেটি পুরুষতান্ত্রিক চরিত্রহনন। কিন্তু তাঁর ব্যবহৃত এই ভাষার যথেষ্ট সমালোচনা না করে যখন সেটিকে আপসহীনতা, পৌরুষ বা বিপ্লবী সাহস হিসেবে উপস্থাপন করা হলো, তখন নারীবিদ্বেষী বক্তব্যও একধরনের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা পেল।

হাদির মৃত্যুর পর তাঁকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে জাতীয় বীর, শহীদ এবং তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, সেখানে তাঁর ইতিবাচক ভূমিকার পাশাপাশি বিতর্কিত ও নারীবিদ্বেষী বক্তব্যগুলোর কোনো সমালোচনামূলক মূল্যায়ন দেখা গেল না। একজন নিহত মানুষের ভালো কাজ স্মরণ করা অবশ্যই মানবিক; কিন্তু বীরায়নের নামে তাঁর ক্ষতিকর বক্তব্যগুলোকে আড়াল করা বা পরোক্ষভাবে পবিত্র করে তোলা বিপজ্জনক। কারণ তখন সমাজের তরুণেরা এই বার্তা পায়—রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় ও ক্ষমতাবান পক্ষের মানুষ হলে নারীর ব্যক্তিগত জীবন ও যৌনতা নিয়ে অবমাননাকর কথা বলাও গ্রহণযোগ্য।

সমাজবিজ্ঞানে একে মডেলিং বা সামাজিক শিক্ষণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। মানুষ শুধু আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে আচরণ শেখে না; সমাজ কাকে পুরস্কৃত করছে, কাকে বীর বলছে এবং কার কোন আচরণের পরও তাকে সম্মানিত করছে, সেখান থেকেও সে শেখে। একজন ব্যক্তি নারীদের সম্পর্কে অপমানজনক ভাষা ব্যবহারের পরও যদি রাষ্ট্র ও সমাজের চোখে প্রশ্নহীন বীরে পরিণত হন, তবে তাঁর অনুসারীরা ধরে নিতে পারে, ওই ভাষা কোনো সমস্যা নয়। বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার সেটিও একটি অনুমোদিত পদ্ধতি।

এখানেই শেখ হাসিনার অন্তর্বাস নিয়ে উল্লাস, হাদির নারীবিষয়ক অবমাননাকর ভাষা এবং পরবর্তী সময়ে নারী শিল্পীদের বিরুদ্ধে মব তৈরির ঘটনাগুলো একই সুতোয় যুক্ত হয়। প্রথম ঘটনায় একজন ক্ষমতাচ্যুত নারীকে তাঁর ব্যক্তিগত পোশাক ও শরীরে নামিয়ে আনা হয়েছে। দ্বিতীয় ঘটনায় নারীর রাজনৈতিক অবস্থানকে তাঁর কথিত যৌন আচরণ বা পবিত্রতা দিয়ে বিচার করা হয়েছে। পরবর্তী ঘটনাগুলোতে সেই একই ভাষা রোকেয়া প্রাচী, জ্যোতিকা জ্যোতি, মেহের আফরোজ শাওন এবং অন্য নারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এভাবে নারীর বিরুদ্ধে অপমান ধীরে ধীরে একটি অনুমোদিত রাজনৈতিক রেপার্টরি বা প্রচলিত কৌশলে পরিণত হয়। অর্থাৎ প্রতিপক্ষ নারী হলে তাঁর বক্তব্যের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই; তাঁর পোশাক, শরীর, বয়স, সম্পর্ক ও যৌনতা নিয়ে কথা বললেই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করা যায়। যখন এই আচরণের বিচার হয় না, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বক্তা সামাজিক মর্যাদা ও বীরত্ব লাভ করেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও একই পদ্ধতি অনুসরণের প্রবণতা জন্ম নেয়।

এই কারণেই বাঁধনের ওপর হামলাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলবে না। বাঁধন নিজেও একজন নারী। আজ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন বলে তাঁকে মবের লক্ষ্য করা হয়েছে। যে সংস্কৃতি আগে অন্য নারীর শরীর ও ব্যক্তিগত জীবনকে অপমানের বৈধ ক্ষেত্র বানিয়েছিল, সেটিই এখন বাঁধনের রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে ফিরে এসেছে। আগের আক্রান্ত নারীদের জন্য নীরব থেকে শুধু বাঁধনের জন্য প্রতিবাদ করলে সমস্যার গোড়াটি অক্ষত থেকে যাবে।

কোনো ব্যক্তিকে জাতীয় বীর হিসেবে সম্মান জানানো মানে তাঁর প্রতিটি কথা ও কাজকে নির্ভুল ঘোষণা করা নয়। প্রকৃত জাতীয় স্মৃতি অন্ধ পূজা নয়; সেখানে শ্রদ্ধার পাশাপাশি নৈতিক মূল্যায়নও থাকে। হাদির হত্যার বিচার দাবি করেও তাঁর নারীবিদ্বেষী ভাষার সমালোচনা করা সম্ভব। ঠিক একইভাবে শেখ হাসিনার শাসনের কঠোর বিচার চেয়েও তাঁর অন্তর্বাস নিয়ে উল্লাসের নিন্দা করা সম্ভব। এই পার্থক্যটি করতে না পারলে আমরা ন্যায়বিচার চাইব না; আমরা শুধু নিজেদের পক্ষের জন্য নৈতিকতার আলাদা সংজ্ঞা তৈরি করব।

একটি সমাজ তার বক্তৃতায় নারীকে যতবার শরীরে নামিয়ে আনে, বাস্তবে সেই নারীর ওপর হাত তোলা ততটাই সহজ হয়ে যায়। শব্দ প্রথমে মানুষকে অমানবিক করে, তারপর মব সেই অমানবিক মানুষটির ওপর আঘাত হানতে শেখে। তাই বাঁধনের ওপর ওঠা হাতটি শুধু ইতালির একটি বিচ্ছিন্ন হাত নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন পাওয়া নারীবিদ্বেষী ভাষা, নির্বাচিত প্রতিবাদ, বিচারহীনতা এবং প্রশ্নহীন বীরায়নের সম্মিলিত ছায়া।

নারীবাদী রাজনৈতিক তত্ত্বে “বডি পলিটিক” ধারণাটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, ক্ষমতা ও রাজনীতির সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক কীভাবে নির্মিত হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সাধারণত ক্ষমতাবান পুরুষকে তাঁর রাজনৈতিক কাজ দিয়ে বিচার করে, কিন্তু ক্ষমতাবান নারীকে বারবার তাঁর শরীর, বয়স, পোশাক, যৌনতা ও পারিবারিক পরিচয়ের মধ্যে নামিয়ে আনে। নারী যতই ক্ষমতাবান হোন, তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একটি শরীর, যাকে প্রকাশ্যে অপমান করা যায়।

শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ঠিক সেই ভাষাই ব্যবহৃত হয়েছিল। তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতার পতনকে যথেষ্ট মনে করা হয়নি; তাঁর নারীসত্তাকেও প্রতীকীভাবে উন্মুক্ত ও অপমানিত করা হয়েছিল। আরও উদ্বেগের বিষয়, রাষ্ট্র ও সমাজের প্রভাবশালী অংশ যখন পাঁচই আগস্টের প্রায় সব ঘটনাকে নির্বিচারে “জনরোষ”, “বিপ্লবী আবেগ” বা “মুক্তির উচ্ছ্বাস” হিসেবে ব্যাখ্যা ও বৈধতা দিল, তখন এই লিঙ্গভিত্তিক অপমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় স্পষ্ট নৈতিক আপত্তি শোনা যায়নি। সামগ্রিক ভাঙচুর ও অপমানকে ঐতিহাসিক ক্ষোভের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও বলা হয়নি, বিপ্লবেরও নৈতিক সীমা আছে এবং কোনো নারীর অন্তর্বাস প্রদর্শন রাজনৈতিক মুক্তির ভাষা হতে পারে না।

সেদিন যদি বলা হতো, শেখ হাসিনার শাসনের বিচার হবে, কিন্তু তাঁর নারীদেহকে অপমান করা যাবে না, তাহলে আজ অন্য নারীদের অপমান করার আগে হয়তো কেউ কেউ থামত। কিন্তু আমরা ঘটনাটিকে হাসি, মিম ও বিজয়ের ছবিতে পরিণত করেছি। সেই মুহূর্তেই নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ এবং তাঁর শরীরকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের সামাজিক অনুমোদন তৈরি হয়েছে।

এরপর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গিয়ে অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী হামলা ও বাধার মুখে পড়লেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু ফুল দিতে যাওয়া একজন নারীকে দলবদ্ধভাবে হেনস্তা করা কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ নয়। জ্যোতিকা জ্যোতিকে শিল্পকলা একাডেমিতে মব তৈরি করে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠল। তাঁর অতীত ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা বা প্রমাণসাপেক্ষ আইনি জবাবদিহি হতে পারে; কিন্তু কর্মস্থলে ঘেরাও করে বের করে দেওয়া বিচার নয়।

মেহের আফরোজ শাওনসহ বিভিন্ন নারী শিল্পীকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে, তা কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের ভাষা নয়। তাঁদের বক্তব্যের সমালোচনা করার পরিবর্তে ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক, শরীর ও চরিত্রকে নিশানা করা হয়েছে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া একজন নারীকেও গালিগালাজ ও হেনস্তা করার দৃশ্য আমরা দেখেছি। শমী কায়সার, তারিন, অরুণা বিশ্বাসসহ কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে বিবেচিত বহু নারী একই ধরনের আক্রমণের মুখে পড়েছেন।

এখানে কারও অতীত ভূমিকা ধুয়ে-মুছে দেওয়া হচ্ছে না। কেউ সহিংসতায় উসকানি দিলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাঁর বিচার হবে। কিন্তু বিচার ও মবের প্রতিশোধ এক নয়। বিচার ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট কাজ ও প্রমাণ বিবেচনা করে; মব মানুষের পরিচয় দেখে শাস্তি দেয়। বিচার আদালতে হয়, মব বিচার বসায় রাস্তায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

দুঃখজনকভাবে, বাঁধনসহ যাঁরা আজ মবের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তাঁদের অনেকের কাছ থেকেই আগের ঘটনাগুলোর সময় জোরালো প্রতিবাদ শোনা যায়নি। বরং নীরবতা কখনো কখনো ঘটনাগুলোর প্রতি পরোক্ষ সম্মতি হিসেবেই প্রতিভাত হয়েছে। আজ বাঁধনের ওপর হামলার প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন করাও অন্যায় নয় যে, রোকেয়া প্রাচী, জ্যোতিকা জ্যোতি, শাওন কিংবা অন্য নারীরা আক্রান্ত হলে এই প্রতিবাদী কণ্ঠগুলো কোথায় ছিল?

আমার পছন্দের নারী আক্রান্ত হলে সেটি নারীবিদ্বেষ, আর আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নারী আক্রান্ত হলে সেটি “জনরোষ”, এই দ্বৈত নীতি কোনো নারীকেই নিরাপদ রাখে না। নারীর মর্যাদা রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার নয়। যে মানবাধিকার বাঁধনের জন্য প্রযোজ্য, একই অধিকার শেখ হাসিনা, রোকেয়া প্রাচী, জ্যোতিকা জ্যোতি ও শাওনের জন্যও প্রযোজ্য।

সমাজবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সহিংসতা ও বিচ্যুতির স্বাভাবিকীকরণ। একটি অন্যায় বারবার ঘটার পরও যদি তার বিচার না হয়, সমাজ ধীরে ধীরে সেটিকে অস্বাভাবিক মনে করা বন্ধ করে দেয়। প্রথমে মিম, তারপর অশ্লীল গালি, এরপর পথরোধ, ঘেরাও এবং শেষ পর্যন্ত শারীরিক আক্রমণ। প্রতিটি বিচারহীন ঘটনা পরবর্তী আক্রমণকারীকে বার্তা দেয়, এই কাজ করা যায় এবং এর কোনো মূল্য দিতে হয় না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় নৈতিক বিচ্ছিন্নতা। আমরা আক্রান্ত মানুষটিকে প্রথমে “দোসর”, “শত্রু” বা অন্য কোনো অবমাননাকর পরিচয়ে চিহ্নিত করি। তারপর নিজেদের বোঝাই, তাঁর সঙ্গে যা হচ্ছে সেটি অন্যায় নয়; তিনি সেটি প্রাপ্য। এভাবে মানুষকে প্রথমে মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়, তারপর তাঁর ওপর আক্রমণকে ন্যায্য বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ইতালিতে বাঁধনকে ঘিরে প্রতিবাদকারীদের কয়েকজনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্যও আমাদের শুনতে হবে, যদিও তাঁদের সব কাজ সমর্থন করতে হবে এমন নয়। তাঁরা বলেছেন, বাংলাদেশে তাঁদের মত প্রকাশ বা প্রতিবাদ করার কার্যকর সুযোগ নেই। তাঁদের অভিযোগ, দেশে বিরোধী রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষকে সভা করতে দেওয়া হয় না, বক্তব্য প্রচার করতে বাধা দেওয়া হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষিদ্ধ বা একঘরে করা হয় এবং প্রতিবাদ করতে গেলে মামলা, হামলা বা গ্রেপ্তারের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাঁদের আরও অভিযোগ, বাঁধনসহ পাঁচই আগস্টের আন্দোলনের পক্ষে সক্রিয় কিছু পরিচিত শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এই একপাক্ষিক পরিবেশের বিরুদ্ধে কথা বলেননি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই রাজনৈতিক বয়ানকে শক্তিশালী করেছেন।

এই প্রবাসীদের ভাষায়, বিদেশের মাটিতে বাঁধন বা তাঁর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সামনে প্রতিবাদ জানানো নিছক ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; এটি এমন একটি ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, যে কাঠামোর ভেতরে দেশে থেকে কথা বলার সুযোগ তাঁরা পাচ্ছেন না। দেশে যে বক্তব্য চাপা পড়ে, বিদেশে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় সেটিই দৃশ্যমান প্রতিবাদে রূপ নেয়। তাঁদের কাছে এটি “কণ্ঠহীন মানুষের কণ্ঠ” এবং দেশে সম্ভব না হওয়া প্রতিরোধের একটি বিকল্প ক্ষেত্র।

রাজনৈতিক তত্ত্বের দৃষ্টিতে এই বক্তব্য একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মিশেল ফুকো বলেছিলেন, যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানেই প্রতিরোধের সম্ভাবনাও থাকে। ক্ষমতা যদি দেশের ভেতরে প্রতিবাদের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দেয়, সেই প্রতিরোধ অন্য জায়গায়, অন্য ভাষায় কিংবা অন্য পদ্ধতিতে প্রকাশিত হবে। আলবার্ট হির্শম্যানের “এক্সিট, ভয়েস অ্যান্ড লয়্যালটি” ধারণা দিয়েও বিষয়টি বোঝা যায়। মানুষ যখন কোনো ব্যবস্থার ভেতরে থেকে নিজের “ভয়েস” বা প্রতিবাদী কণ্ঠ ব্যবহার করতে পারে না, তখন সে “এক্সিট” বা দেশত্যাগের পথ বেছে নিতে পারে। কিন্তু দেশ ছেড়ে গেলেও তার ক্ষোভ ও রাজনৈতিক দাবি শেষ হয় না; প্রবাসে গিয়ে সে আবার নিজের হারানো কণ্ঠ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে।

এই কারণেই বিদেশে কোনো মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, শিল্পী বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা, প্ল্যাকার্ড দেখানো, স্লোগান দেওয়া কিংবা শান্তিপূর্ণভাবে পথ আটকে জবাব চাওয়াকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মব বলা ঠিক হবে না। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকার। একজন শিল্পী যখন শুধু শিল্পী নন, বরং একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের দৃশ্যমান মুখ বা কোনো ক্ষমতাকাঠামোর নৈতিক সমর্থকে পরিণত হন, তখন তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বৈধ। জনপ্রিয়তা বা শিল্পী পরিচয় কাউকে জনসমালোচনা থেকে রক্ষা করার ঢাল হতে পারে না।

কিন্তু এখানেই একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা টানতে হবে। প্রতিরোধ এবং মব এক বিষয় নয়। প্রশ্ন করা প্রতিরোধ, কিন্তু মারধর করা অপরাধ। স্লোগান দেওয়া প্রতিবাদ, কিন্তু শারীরিকভাবে ঘিরে ধরে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হেনস্তা। রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা বৈধ, কিন্তু নারী বলে তাঁর শরীর, পোশাক, সম্পর্ক বা যৌনতা নিয়ে আক্রমণ করা নারীবিদ্বেষ। কাউকে জনসমক্ষে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো গণতান্ত্রিক হতে পারে; কিন্তু তাঁকে স্পর্শ করা, ধাক্কা দেওয়া, হুমকি দেওয়া বা নিরাপত্তাহীন করে তোলা গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের সীমা অতিক্রম করে।

প্রবাসীদের ক্ষোভের উৎস তাই বুঝতে হবে, কিন্তু সেই ক্ষোভের প্রতিটি বহিঃপ্রকাশকে বৈধতা দেওয়া যাবে না। দেশে প্রতিবাদের দরজা বন্ধ করা হলে বিদেশে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হবে, এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। সুতরাং শুধু প্রবাসীদের আচরণ নিন্দা করলে হবে না; যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাঁদের স্বাভাবিকভাবে কথা বলার পথ বন্ধ করেছে বলে তাঁরা মনে করছেন, সেটিরও জবাবদিহি চাইতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসীদেরও বুঝতে হবে, যে মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাঁরা দাঁড়াতে চান, নিজেরা সেই একই পদ্ধতি গ্রহণ করলে তাঁদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাঁধন কিংবা অন্য শিল্পীদেরও এই ক্ষোভকে কেবল “পরাজিত শক্তির আক্রমণ” বলে প্রত্যাখ্যান করলে চলবে না। তাঁদের প্রশ্ন করা উচিত, কেন দেশের একটি অংশ মনে করছে তাদের কথা বলার কোনো জায়গা নেই? কেন তারা বিশ্বাস করছে কিছু শিল্পী শুধু একটি পক্ষের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য কথা বলেন? বাঁধনের ওপর শারীরিক আক্রমণের নিন্দা যেমন জরুরি, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রশ্ন ও প্রতিবাদের অধিকারও স্বীকার করতে হবে।

সুতরাং পূর্ণাঙ্গ সত্যটি মাঝখানে অবস্থান করে। প্রতিবাদকারীদের সব অভিযোগ মিথ্যা বলে বাতিল করা যাবে না, আবার তাঁদের ক্ষোভকে শারীরিক আক্রমণের লাইসেন্সও দেওয়া যাবে না। ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গণতন্ত্রের প্রাণ; কিন্তু সেই প্রতিরোধ যদি প্রতিপক্ষের মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেয়, তবে সেটিও শেষ পর্যন্ত আরেক ধরনের ক্ষমতা ও নিপীড়নে পরিণত হয়।

কিন্তু মবের কোনো স্থায়ী বন্ধু নেই। আজ সে এক রাজনৈতিক পক্ষের নারীকে অপমান করবে, কাল জুলাই আন্দোলনের সমর্থক বাঁধনকে আক্রমণ করবে, পরদিন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নতুন কাউকে নিশানা করবে। যারা ভাবেন মবকে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাময়িকভাবে ব্যবহার করবেন, তাঁরা ভুলে যান, মবকে ডাকা যায়, কিন্তু সব সময় ঘরে ফেরানো যায় না।

বাঁধনের ওপর হামলা তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সেই দীর্ঘ শৃঙ্খলের আরেকটি পর্ব, যার শুরু হয়েছিল প্রতিপক্ষের মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে এবং যা আরও শক্তিশালী হয়েছে বিচারহীনতা ও নির্বাচিত নীরবতার কারণে। আগে অন্যদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে বলে বাঁধনের সঙ্গে অন্যায় বৈধ হয়ে যায় না। আবার বাঁধনের জন্য প্রতিবাদ করতে গিয়ে আগের আক্রান্ত নারীদের ভুলে যাওয়াও নৈতিকতা নয়।

এখনও সময় আছে একটি সর্বজনীন নীতি গ্রহণ করার: রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, কোনো নারীকে তাঁর শরীর, পোশাক, সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে অপমান করা যাবে না; কাউকে মব তৈরি করে ঘেরাও বা আক্রমণ করা যাবে না। প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও যে নীতি রক্ষা করতে পারি, সেটিই প্রকৃত নৈতিকতা।

যে আগুনকে আমরা প্রতিপক্ষের ঘর পোড়াতে উৎসাহ দিই, বাতাস ঘুরলে সেই আগুন নিজের ঘরও চেনে না। আজ বাঁধন সেই আগুনের আঁচ অনুভব করেছেন। কাল কে করবেন, আমরা জানি না। তাই প্রশ্নটি শুধু বাঁধনের নিরাপত্তা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি হলো, আমরা কি আইনের সমাজ চাই, নাকি এমন এক জনপদ চাই, যেখানে পালাবদলের সঙ্গে শুধু মবের লক্ষ্য বদলাবে?

প্রফেসর ডঃ শ্যামল দাস, ভার্জিনিয়া। ইউএসএ

এই শাখার আরও খবর

নারীদের অপমান না করার বার্তা দিলেন থালাপতি বিজয়

তামিলনাড়ুর জনপরিসরে নারীদের নিয়ে আপত্তিকর, অশ্লীল ও মানহানিকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ও অভিনেতা থালাপতি বিজয়। তিনি বলেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে কোনোভাবেই ব্যক্তিগত…

ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞার জেরে কনস্যুলেট বন্ধ করছে ইসরায়েল

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার জেরে জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। একই সঙ্গে সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিনসহ…

ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন কোনো তথ্য নেই: রণধীর জয়সওয়াল

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়ে ভারতের কাছে এখনো নতুন কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন…

আওয়ামী লীগে শেখ সেলিমকে নিয়ে আলোচনা কেন

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে ঘিরে। দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের পর…

ইরানের ২৭ এয়ারলাইনসহ ৩৬ প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

ইরানের বিমান চলাচল খাতকে সহায়তার অভিযোগে দেশটির ২৭টি এয়ারলাইনসহ মোট ৩৬টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এই নিষেধাজ্ঞার ফলে…

রাজনৈতিক ইসলাম’ সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব আনছে অস্ট্রিয়া

অস্ট্রিয়ায় তথাকথিত ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব তৈরির কাজ শুরু করেছে দেশটির সরকার। চ্যান্সেলর ক্রিশ্চিয়ান স্টকার এ ধরনের আইন প্রণয়নের পক্ষে অবস্থান…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au