আজ বাঁধন, কাল কে?: নারীদেহ, ক্ষমতাহীনের প্রতিরোধ, রাজনীতি ও মব সংস্কৃতির বুমেরাং
ভার্জিনিয়া: আজ সকালে আমার এক বন্ধু বললেন, “দাদা, কিছু কইলেন না যে”! আমি বুঝেও বললাম, “কী বিষয়ে”? তিনি যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। আমাকে বললেন,…
সকাল থেকে গ্যাস নেই, রান্না করতে গিয়ে বাড়তি খরচে কিনতে হচ্ছে সিলিন্ডার। সন্ধ্যায় কর্মস্থল থেকে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেও মিলছে না বিদ্যুৎ। এর মধ্যে বাজারে গেলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য গুনতে হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি টাকা। আয় না বাড়লেও কমছে না খরচ, বরং একের পর এক নতুন ব্যয় যুক্ত হচ্ছে সংসারে। ফলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের জীবন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। আগে নির্দিষ্ট সময় বা কিছু এলাকায় গ্যাসের সমস্যা দেখা গেলেও এখন অনেক বাসাবাড়িতে নিয়মিত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে বেড়েছে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিও।
জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়া, এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
গ্যাসের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক যেখানে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন, সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে সরবরাহ ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচেও নেমেছে।
এর মধ্যে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। কোনো কোনো সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটেরও বেশি হয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না থাকায় সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
মিরপুরের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরে একটু বিশ্রাম নেবো, সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। প্রায় সময়ই বাসায় আসি আর বিদ্যুৎ চলে যায়। সন্ধ্যার পর থেকে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়।’
একই এলাকার বাসিন্দা আফসারি খানম বলেন, ‘আগে শীতের সময় আমাদের এখানে গ্যাসের সমস্যা হতো। অন্য সময় ঠিক থাকতো। এখন তো কোনো সময়ই গ্যাস থাকে না। বিদ্যুৎও দিনে তিন-চারবারের বেশি চলে যায়।’
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট শুধু মানুষের ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, বাড়িয়ে দিচ্ছে সংসারের খরচও। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেকে জেনারেটর বা বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করছেন। আবার গ্যাস না থাকায় কেউ সিলিন্ডার কিনছেন, কেউ রান্নার জন্য ব্যবহার করছেন ইলেকট্রিক চুলা। এতে মাসিক ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত খরচ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমত উল্লাহ বলেন, আপাতত জ্বালানি সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো গেলে লোডশেডিং কমানো সম্ভব। তবে তাৎক্ষণিকভাবে পুরো সংকট দূর করার সুযোগ সীমিত। দ্রুত অতিরিক্ত জ্বালানি এনে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সহজ নয়। একই সঙ্গে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। তবে জ্বালানি সরবরাহ বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানোর সুযোগ সরকারের রয়েছে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি শিল্পখাতেও দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ব্যাংকঋণ ও নগদ অর্থের সংকটসহ বিভিন্ন কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে।
শিল্প পুলিশ, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বা বিজিএমইএ এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বা বিকেএমইএর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিজিএমইএর সদস্য অন্তত ৮০টি কারখানায় প্রায় ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে শিল্পকারখানা বন্ধের প্রবণতা নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়। এসব কারখানায় কর্মরত ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক ও কর্মচারী কর্মসংস্থান হারান।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে গাজীপুরে ৫৪টি, নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী অঞ্চলে ২৩টি এবং সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই এলাকায় ১৮টি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়। গাজীপুরে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর প্রায় সবই তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতসংশ্লিষ্ট। শুধু এই জেলাতেই প্রায় ৪৫ হাজার ৭৩২ শ্রমিক ও কর্মচারী চাকরি হারান।
গত ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে চার শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ২৮২টি এবং বিকেএমইএর সদস্য ১২৩টি কারখানা রয়েছে।
একটি কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু একজন শ্রমিকের চাকরি হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারের আয় কমে যায়, সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, বাড়িভাড়া ও বাজার খরচ কমিয়ে আনতে হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় দোকান, পরিবহন ও ছোট ব্যবসাগুলোও ক্ষতির মুখে পড়ে।
সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। জুলাইয়ের সার্বিক মূল্যস্ফীতি গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
তবে মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো, আগের তুলনায় পণ্যের দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে যেসব পণ্যের দাম ইতিমধ্যে অনেক বেড়ে গেছে, সেগুলো আগের দামে ফিরে আসছে না।
এ কারণে বাজারে স্বস্তি ফিরছে না বলে মনে করছেন সাধারণ ক্রেতারা। সবজি, ডিম, মাছ, মাংস, তেল, চিনি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনও অনেক পরিবারের মাসিক বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বাজার করতে আসা কাওসার আহমেদ বলেন, ‘শুনছি গ্যাস, কারেন্ট এসবের ঘাটতির জন্য নাকি চিনির দাম বেড়ে গেছে, আটার দামও বেড়েছে। যদি আসলেই গ্যাস-কারেন্টের জন্য এসবের দাম বেড়ে থাকে, তাহলে আমাদের বিপদ আছে।’
সাধারণ মানুষের সংকট শুধু বাজারদরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সংসার চালানোর অন্যান্য খরচও বাড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা, গ্যাস না থাকলে সিলিন্ডার, যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসাভাড়ার মতো নিয়মিত ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এসব অতিরিক্ত খরচ।
অন্যদিকে আয় একই থাকায় সংসারের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেকেই বাজারের তালিকা ছোট করছেন, আগের তুলনায় কম মাছ-মাংস কিনছেন কিংবা সন্তানের অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন। চাকরি হারানো পরিবারগুলোর কেউ সঞ্চয় ভাঙছেন, আবার কেউ ধার করে সংসার চালাচ্ছেন।
অর্থনীতির পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার খবর স্বস্তির হতে পারে। কিন্তু একটি পরিবারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাব হলো, মাস শেষে আয় থেকে কত টাকা হাতে থাকছে। বাজার, জ্বালানি ও দৈনন্দিন ব্যয় কমে না এলে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরতে সময় লাগবে।
সব মিলিয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তুলনামূলক উচ্চমূল্য, তিন দিকের চাপ একসঙ্গে এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাব থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার মান পর্যন্ত।
এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, আয় না বাড়লেও অন্তত যেন নিত্যদিনের খরচ আর না বাড়ে, ঘরে যেন নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ থাকে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ যেন আরও সংকুচিত না হয়।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au