ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২২ অক্টোবর- বাংলাদেশের রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেশের ওষুধশিল্পে বড় ধরনের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিপুল পরিমাণ ওষুধ তৈরির কাঁচামাল, স্পেয়ার পার্টস এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি পুড়ে যাওয়ায় অনেক জরুরি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই)। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, এই অগ্নিকাণ্ড শুধু আর্থিক ক্ষতির নয়, বরং দেশের ওষুধনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তারা সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ ও সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) রাজধানীর গুলশানে বিএপিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা জানান, এই অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২০০ কোটি টাকার ওষুধ কাঁচামাল সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পুড়ে নষ্ট হয়েছে। এসব উপকরণের মধ্যে ছিল অ্যান্টিবায়োটিক, ক্যানসার ওষুধ, ডায়াবেটিসের ওষুধ, টিকা, হরমোন এবং বিশেষ নিয়ন্ত্রিত উপাদান, যেগুলোর আমদানিতে সরকারের কঠোর অনুমোদন প্রয়োজন হয় এবং যেগুলো পুনরায় আমদানির প্রক্রিয়াও সময়সাপেক্ষ ও জটিল। অনেক উপকরণ নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়, কিন্তু আগুনের পর সেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ফলে কার্গো এলাকায় থাকা এমন অনেক কাঁচামালও ঝুঁকিতে পড়েছে, যেগুলো আগুনে সরাসরি পুড়ে না গেলেও ব্যবহার অযোগ্য হয়ে যেতে পারে।
বিএপিআইয়ের মহাসচিব জাকির হোসেন জানান, দেশে বর্তমানে ৩০৭টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থাকলেও এর মধ্যে ২৫০টি সক্রিয়ভাবে উৎপাদন করছে। এই ঘটনায় অন্তত ৪৫টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, সব প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া গেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তিনি আরও জানান, অনেক কাঁচামাল ছিল নারকোটিকস বিভাগের অনুমোদিত সংবেদনশীল উপাদান, যেগুলো পুনরায় আমদানি করতে হলে আবার পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে হবে। এতে ওষুধের উৎপাদন দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হওয়ার বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএপিআই নেতারা বলেন, এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ও দেশের ওষুধ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সরকারের দ্রুত আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। আগুনে পুড়ে যাওয়া কাঁচামালের জন্য ইতোমধ্যে পরিশোধ করা কাস্টমস শুল্ক, ডিউটি ও ভ্যাট ফেরত দেওয়ার দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের সুদ ও চার্জ মওকুফ করা এবং দ্রুত নতুন করে এলসি খুলে কাঁচামাল আমদানির জন্য সহজ শর্ত দেওয়ার আহ্বান জানান।
এ ছাড়া বিমান কার্গো এলাকায় থাকা স্পেয়ার পার্টস ও গুরুত্বপূর্ণ মেশিনারিজও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে ওষুধ উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে সময় লাগবে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও বিলম্ব দেখা দিতে পারে। অন্য কাঁচামালগুলোও এখন ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ যেসব উপকরণ নির্দিষ্ট তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, সেগুলোর নিরাপত্তা এখন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিএপিআইয়ের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং সার্বিক ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা সাধারণ মানুষের ওষুধপ্রাপ্তি ব্যাহত করবে। তারা আশা প্রকাশ করেন, সরকার জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করলে ওষুধশিল্প ফিরতে পারবে স্বাভাবিক অবস্থায়; অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হতে পারে।