সমীক্ষাকে ‘রাজনৈতিক চক্রান্ত’ বললেন মমতা, ভোটের ফল নিয়ে আত্মবিশ্বাসী তৃণমূল
মেলবোর্ন, ১ মে- পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বুথফেরত সমীক্ষা ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যজুড়ে। ভোট শেষ হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন…
মেলবোর্ন, ২৮ অক্টোবর: বাংলাদেশ আজ এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে গণতন্ত্রের পুনর্গঠন, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা-এই দুই শক্তির সংঘাত এখন জাতীয় স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় হুমকি।
ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে, এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ এশীয় কূটনীতিতে নতুন এক অস্বস্তি তৈরি করেছে।
কিন্তু এই পরিবর্তনের ভেতরে বাংলাদেশের যে শিক্ষা নেওয়া উচিত, তা পাকিস্তানের কাছ থেকে নয় ভারতের কাছ থেকে। ভারত তার সেনাবাহিনীকে সর্বদা রাজনীতির বাইরে রেখেছে, যেখানে পাকিস্তান রাষ্ট্রটিই সেনাবাহিনীর কাঁধে তৈরি। আর বাংলাদেশ ১৯৭৭ সালেই এই ভুলের ভয়াবহ মূল্য দিয়েছে। আজ সেই পথেই আবার এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১৫ জন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতা। এই গ্রেফতারের মধ্যে ৩০ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) থেকে ওয়ারেন্ট জারি হয়, যাদের ২৫ জনই সেনা কর্মকর্তা ৯ জন অবসরপ্রাপ্ত, ১৫ জন কর্মরত।
প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নাম উঠে এসেছে। আরও পাঁচজন সাবেক ডিরেক্টর জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (DGFI) কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
এই পদক্ষেপে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকের-উজ-জামান বাধ্য হন সৌদি আরব সফর বাতিল করতে। অনেক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখাচ্ছেন অভিযোগ, তিনি ইউনুস সরকারের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়।
বিশ্লেষক সুবীর ভৌমিক লিখেছেন, “যদি সেনাপ্রধান ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেন, তবে সৈন্যদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি আছে; আর যদি অতিরিক্ত কঠোর হন, তবে সামরিক অভ্যুত্থান অনিবার্য হয়ে উঠবে।”
২০২৫ সালের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে রাজনৈতিক সহিংসতায় সেনাবাহিনীর গুলিতে চারজন আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হন বলে অভিযোগ। এই ঘটনাটি জাতিসংঘে পৌঁছায়, এবং International Crimes Research Foundation সংগঠনটি জাতিসংঘের কাছে তদন্তের আহ্বান জানায়। তবে এখন পর্যন্ত সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশি সাংবাদিক শহিদুল হাসান খোকন বলেন, “প্রতিদিন সেনাবাহিনীকে আরও গভীরভাবে রাজনীতির কাদায় টেনে নেওয়া হচ্ছে।”
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৭ সাল এক কালো অধ্যায়। জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনে ২ অক্টোবর ১৯৭৭-এর অভ্যুত্থানচেষ্টার পর শত শত সেনা ও বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা গুলিতে ও ফাঁসিতে মৃত্যুবরণ করেন।
সাংবাদিক জায়েদুল আহসান পিন্টুর গবেষণায় দেখা যায়, তখনকার সামরিক ট্রাইব্যুনালে রায় পড়ে শোনানো হতো জিয়ার স্বাক্ষর করা পূর্বলিখিত নথি থেকে। কমপক্ষে ১,৫০০ সেনা কর্মকর্তা হত্যার শিকার হন। শত শত পরিবারের সন্তান, স্বামী, ভাই হারিয়ে নিখোঁজ থেকে যায় চিরদিনের জন্য।
অবশেষে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে নিজ সেনাদের হাতেই নিহত হন জিয়াউর রহমান। তার আগেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও সেনা সদস্যদের একটি অংশ হত্যা করেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।
ইতিহাস থেকে বোঝা যায় যে সেনাবাহিনী যদি রাজনীতির উপকরণে পরিণত হয়, সে শেষ পর্যন্ত নিজেই ধ্বংসের পথে যায়।
ভারত তার স্বাধীনতার পর থেকে একটি নীতিতে অনড় সেনাবাহিনী কখনও রাজনীতির ক্ষেত্র ছোঁবে না। দেশটির সামরিক বাহিনী শুধু প্রতিরক্ষার দায়িত্বে, রাষ্ট্রক্ষমতা বা নীতিনির্ধারণে নয়।
অন্যদিকে, পাকিস্তান তার জন্মলগ্ন থেকেই সেনানির্ভর। “Every country has an army, but Pakistan’s army has a country” এই প্রবচনই সেই বাস্তবতা। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এখন সেই পথেই যাচ্ছে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যেখানে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক বিভাজনের কেন্দ্রে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে পুনরায় সেই নৈতিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে। যেখানে তারা রাষ্ট্রের নয়, সংবিধানের রক্ষক। যুদ্ধাপরাধ, গুম, নির্যাতন যে অপরাধই হোক, তদন্ত হওয়া উচিত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে; কিন্তু সেনাবাহিনীকে বিচার বা প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত করলে সেটি গণতন্ত্রের জন্য আত্মঘাতী হবে।
ভারতের মতোই বাংলাদেশেরও উচিত সেনাবাহিনীকে দূরে রেখে রাজনৈতিক সংস্কার করা। নইলে ইতিহাস আবারও ১৯৭৭ কিংবা ১৯৮১ সালের মতো পুনরাবৃত্তি ঘটাবে।
লেখক: দীপ হালদার একজন ভারতীয় সাংবাদিক ও লেখক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, ইতিহাস এবং মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করছেন। তাঁর লেখায় বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের সামরিক রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার টানাপোড়েন স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
তিনি নিয়মিত লেখেন The Print, The Times of India, এবং India Today-এর মতো প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্মে। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর পরিচিতি @deepscribble নামে, যেখানে তিনি দক্ষিণ এশীয় সমাজ ও রাজনীতির বিষয়ে ধারালো মতামত প্রকাশ করেন।
এই লেখার মতামত সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au