বাড়তে থাকা ঋণ এখন বাস্তব উদ্বেগের কারণ, কারণ এটি দেশের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা ক্ষয় করছে এবং আন্তর্জাতিক ঋণবাজারে প্রবেশাধিকারকে সীমিত করছে।
মেলবোর্ন, ৩ অক্টোবর- বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, বাংলাদেশও নিজস্ব আর্থিক ভারসাম্যের পরীক্ষায় পড়ছে। বাড়তে থাকা ঋণ এখন বাস্তব উদ্বেগের কারণ, কারণ এটি দেশের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা ক্ষয় করছে এবং আন্তর্জাতিক ঋণবাজারে প্রবেশাধিকারকে সীমিত করছে।
ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান এখন বিশ্বের শীর্ষে, যার ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২৬১ শতাংশ। অর্থনীতির জন্য কোনও নির্দিষ্ট ঋণ-জিডিপি অনুপাতকে টেকসই বলা যায় না। তবে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণের স্থিতিশীলতা মূল্যায়নে একটি সূচক নির্ধারণ করেছে—যেখানে বহিঋণ জিডিপির ৩৫ থেকে ৭৫ শতাংশের মধ্যে হলে দেশগুলোকে দুর্বল, মাঝারি বা শক্ত অবস্থানে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই অনুপাত ক্রেডিটযোগ্যতার সূচক হিসেবে কাজ করে। তবে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ গত এক দশকে দেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২০১৫ অর্থবছরের ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ অর্থবছরে প্রায় ৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ এখন শুধু উন্নয়নশীল দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। এশিয়ায় জাপানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২৩৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুরের ১৭৪ শতাংশ, আর জার্মানির প্রায় ৬৪ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে এই অনুপাত ১২২ শতাংশে পৌঁছেছে।
ধনী দেশগুলো মূলত সামাজিক কর্মসূচি, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ধার করছে। ইউরোপ, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ায় তরুণ প্রজন্মের করের টাকা পেনশন ও প্রবীণ সেবায় ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে, বিশেষ করে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যে।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য আরও আর্থিক বোঝা তৈরি করেছে। ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বেড়ে ৪৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় অনেক বেশি।
নির্বাচনও সমস্যাকে বাড়াচ্ছে। রাজনীতিবিদরা প্রায়ই কর কমানো ও সামাজিক ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন, যা ঘাটতি না বাড়িয়ে পূরণ করা অসম্ভব। ফলে “অদায়িত্বশীল বাজেট” এখন রাজনৈতিক রুটিনে পরিণত হয়েছে।
মহামারি ও পরবর্তী চাপ
কোভিড-১৯ মহামারি এক বড় মোড় এনেছিল। অর্থনৈতিক ধস ঠেকাতে উন্নত দেশগুলো বিপুল অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়। পরে ইউক্রেন যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার ফলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যায়, সরকারগুলো আবারও ভর্তুকির পথে হাঁটে—ফলে ঘাটতি আরও বেড়ে যায়।
এখন উন্নত বিশ্বকে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও আর্থিক ভারসাম্যহীনতা। ফ্রান্স, জাপান ও যুক্তরাজ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তন জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলন। কর বাড়ছে, সুবিধা কমছে, আর ঋণের সুদ দিতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যয় চাপে পড়ছে।
যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে বড় কর বৃদ্ধি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা আরও নাজুক—ফেডারেল ঘাটতি এখন জিডিপির ৬ শতাংশ, আর সরকারি ঋণ ছাড়িয়েছে ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার। গত দশকে সুদ পরিশোধে খরচ হয়েছে ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা আগামী দশকে বেড়ে ১৪ ট্রিলিয়নে পৌঁছাবে বলে অনুমান।
বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো আইএমএফের ৫৫ শতাংশ সীমার নিচে, কিন্তু তা আত্মতুষ্টির কারণ হতে পারে না। রাজস্ব আয় স্থবির, সুদ পরিশোধ বাড়ছে, আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় ঋণ বৃদ্ধি দ্রুততর হচ্ছে।
মাত্র তিন বছরে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ তিনগুণ বেড়ে ২০২৪ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১.৩ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারে ঋণের সুদ পাঁচগুণ বেড়ে যাওয়ায় চাপ আরও বেড়েছে। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১৭ শতাংশের মতো হলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই “আরামের সীমা” আসলে পরিবর্তনশীল।
মুদ্রাস্ফীতি টানা চার মাস ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স কিছুটা স্থিতিশীলতা এনেছে, তবে বেসরকারি বিনিয়োগ ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশে থেমে আছে, যা ব্যবসায়িক সতর্কতার ইঙ্গিত দেয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ সুদহার ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাচ্ছে এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর সামাজিক চাপ বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গা সতর্ক করে বলেছেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বজুড়ে ১.২ বিলিয়ন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে, কিন্তু চাকরির সুযোগ হবে মাত্র ৪০০ মিলিয়ন। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অবকাঠামো, কৃষি, স্বাস্থ্য, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজিত উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্য এই পরামর্শ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ এখন অর্ধশতাব্দী আগের ৭ ডলার থেকে বেড়ে ৪৫৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দেশের ঋণ টেকসই থাকবে কি না, তা এখন নির্ভর করছে এই বিনিয়োগগুলো কতটা উৎপাদনশীল হচ্ছে তার ওপর যা কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নির্ধারণ করবে।
সুত্রঃ টিবিএস