বাংলাদেশ

বিস্ফোরণে দুই সেনাসদস্য নিহত

হাটহাজারীতে ট্যাংক বিস্ফোরণের মূল কারণ নিম্নমানের পাকিস্তানি গোলাবারুদ

  • 4:03 am - September 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৬ বার
হাটহাজারীতে ট্যাংক বিস্ফোরণ। ছবিঃ সংগৃহীত

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ চলাকালে ট্যাংকে বিস্ফোরণের ঘটনায় দুই সেনাসদস্য নিহত হওয়ার পেছনে চীনে তৈরি ট্যাংকের ত্রুটি নয়, পাকিস্তান থেকে আমদানি করা কথিত নিম্নমানের গোলাবারুদ ভূমিকা রেখেছে কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। একটি নির্ভরযোগ্য সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে এমন দাবি করা হয়েছে।

গত ৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফায়ারিং রেঞ্জে সরাসরি গোলাবর্ষণ প্রশিক্ষণের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর টাইপ-৫৯জি ‘দুর্জয়’ প্রধান যুদ্ধট্যাংকে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আবু বকর সিদ্দিক ও তাসনিম রাফায়েত নামে দুই সেনাসদস্য নিহত হন। এ ঘটনায় ক্যাপ্টেন মির্জা গুরুতর আহত হয়েছেন।

সামরিক সূত্রটির দাবি, প্রাথমিক তদন্তে দুর্ঘটনার সঙ্গে পাকিস্তান থেকে আমদানি করা গোলাবারুদের ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। তদন্তকারীরা ট্যাংকের কামানের নল, গোলাবারুদের মান, বিস্ফোরণের ধরনসহ একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখছেন।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাটি ঘটে চীনা প্রযুক্তিতে আধুনিকায়ন করা টাইপ-৫৯জি ট্যাংকে। তবে বিস্ফোরণের ঘটনাটি ওই ট্যাংকের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ঘটেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। প্রাথমিক কারিগরি বিশ্লেষণে কামানের নলের ভেতরে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কামানের নলের ভেতরে কার্বন জমে যাওয়া কিংবা বাইরের কোনো বস্তুর টুকরা ঢুকে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে গোলা ও বিস্ফোরক গ্যাস স্বাভাবিকভাবে বের হতে না পেরে নলের ভেতরে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে কামানের নল বা গোলাবারুদের কক্ষে মারাত্মক চাপ তৈরি হয়ে ভেতরেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

তবে এ ধরনের সম্ভাবনার পাশাপাশি গোলাবারুদের ত্রুটি বা নিম্নমানের বিষয়টিও তদন্তকারীরা বিবেচনায় রাখছেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানি গোলাবারুদ ব্যবহারের বিষয়টি তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সামরিক সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাকিস্তান থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই সময় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের তৎকালীন প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানের উদ্যোগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

সূত্রের দাবি, ওই সময় পাকিস্তান থেকে প্রায় ৪০ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ, ২ হাজার ট্যাংক গোলা, ৪০ টন আরডিএক্স এবং ২ হাজার ৯০০টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রজেক্টাইল আমদানি করা হয়। এসব গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক পর্যাপ্ত মান যাচাই ও মানসম্মতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে আমদানি করা এসব গোলাবারুদের কিছু অংশ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ফায়ারিং রেঞ্জে প্রশিক্ষণের সময় ব্যবহার করা হয়। হাটহাজারীর ফায়ারিং রেঞ্জে গত ৯ সেপ্টেম্বর যে প্রশিক্ষণের সময় প্রাণঘাতী বিস্ফোরণ ঘটে, সেখানেও পাকিস্তান থেকে আনা গোলাবারুদ ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে বলে সামরিক সূত্রটির দাবি।

তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানি গোলাবারুদকেই বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা যাচ্ছে না। দুর্ঘটনার কারিগরি কারণ নির্ধারণে ট্যাংকের কামানের নল ও গোলাবারুদের অবস্থা, ব্যবহৃত গোলাবারুদের ব্যাচ ও লট নম্বর, সংরক্ষণ পদ্ধতি, গোলাবারুদের মান যাচাইয়ের নথি, গোলাবর্ষণের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট ক্রয়প্রক্রিয়ার নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এদিকে হাটহাজারীর এ দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া ইউনিটের জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করা গোলাবারুদের ক্রয়, গ্রহণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের প্রক্রিয়াও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে বিদেশি উৎস থেকে আমদানি করা গোলাবারুদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নির্ধারিত কারিগরি মান পূরণ করেছিল কি না, সেটিই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পুরোনো সাঁজোয়া যানগুলোর অন্যতম হলো টি-৫৯ সিরিজের ট্যাংক। দুর্ঘটনার প্রায় আট মাস আগে চীনের দুটি কারিগরি দল বাংলাদেশে এসেছিল। গত ১২ ও ১৩ জানুয়ারি চীনা প্রযুক্তিবিদদের এসব দল বাংলাদেশে এসে টি-৫৯ ট্যাংকের মেরামত ও আধুনিকায়নের কাজ করে। প্রথমে তাদের ঢাকার কাছে রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাসে নেওয়া হয়। পরে চট্টগ্রামের চরিয়া ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে তাদের কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয় বলে সূত্রে জানা গেছে।

কয়েক বছর আগে টি-৫৯ ট্যাংকগুলোকে বড় ধরনের আধুনিকায়ন করা হয়। এতে নতুন টারেট, ১২৫ মিলিমিটার কামান এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়। আধুনিকায়নের পর এসব ট্যাংক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া বহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

গত ৯ সেপ্টেম্বরের দুর্ঘটনায় এই আধুনিকায়ন করা টাইপ-৫৯জি ‘দুর্জয়’ ট্যাংকই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সরাসরি গোলাবর্ষণ প্রশিক্ষণের সময় হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ট্যাংকের ভেতরে থাকা দুই সেনাসদস্য নিহত এবং একজন কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন।

সামরিক সূত্রটি আরও দাবি করেছে, পাকিস্তান থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সামরিক বিমান কেনার বিষয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা আগ্রহী ছিলেন। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে পাকিস্তানি প্রযুক্তিতে তৈরি গোলাবারুদ ও বিমান কেনার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।

এসব প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটাকে ঘিরে কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছিল বলে সামরিক সূত্রটির দাবি। ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে পাঠানো হয়েছিল বলেও সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রতি জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের আগ্রহ এখনো অব্যাহত রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সম্পর্ক নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা গোলাম আযমের ছেলে এবং সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমী এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবদুল হক পাকিস্তান থেকে গোলাবারুদ আমদানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে কামরুল হাসানের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল বলেও ওই সূত্র দাবি করেছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে হাটহাজারীর ট্যাংক বিস্ফোরণের জন্য পাকিস্তানি গোলাবারুদকে দায়ী করার দাবিও এখনো তদন্তাধীন একটি সম্ভাবনা মাত্র।

দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তকারীদের উদ্ধার করা গোলাবারুদ ও তার অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট গোলাবারুদের লট ও ব্যাচের তথ্য, সংরক্ষণের পরিবেশ, ট্যাংকের কামানের নল ও গোলাবারুদের কক্ষের অবস্থা, গোলাবর্ষণের সময়কার কার্যপদ্ধতি এবং গোলাবারুদ আমদানি ও গ্রহণের নথিপত্র পরীক্ষা করা হবে।

তদন্তে যদি দেখা যায়, ব্যবহৃত গোলাবারুদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নির্ধারিত কারিগরি মান পূরণ করেনি, তাহলে আমদানি থেকে শুরু করে মান যাচাই, গ্রহণ ও প্রশিক্ষণে ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আর যদি ট্যাংকের কামানের নলের ভেতরে কোনো প্রতিবন্ধকতা বা যান্ত্রিক ত্রুটিই বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়, তাহলে গোলাবারুদের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল হবে।

ফলে হাটহাজারীর এই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে এখন তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিম্নমানের বা ত্রুটিপূর্ণ পাকিস্তানি গোলাবারুদের কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছে, এমন দাবি নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ

এই শাখার আরও খবর

যুক্তরাষ্ট্রে ১৩২ বছরের রেকর্ড ভেঙে সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম, ইউরোপেও উষ্ণতম আগস্ট

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড রাখা শুরুর পর ১৩২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম পার হয়েছে। জুন থেকে আগস্ট…

ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৪৯২

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছেই। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪৯২ জন।…

ময়মনসিংহে যুবককে পেট্রল ঢেলে আগুন, হাসপাতালে মৃত্যু

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ফরহাদ হোসেন (৩৫) নামে এক যুবকের শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দগ্ধ অবস্থায় পাশের জলাশয়ে লাফ দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি…

কাচের ছাদ ধসে তরুণের মৃত্যু, কঠোর শাস্তির দাবি পরিবারের

অস্ট্রেলিয়ার পার্থে কার্টিন ইউনিভার্সিটিতে নির্মাণাধীন কাচের ছাদ ধসে ২৩ বছর বয়সী এক তরুণের মৃত্যুর মর্মান্তিক ভিডিও প্রকাশ করেছে আদালত। ছাদ ধসে ২০ মিটার নিচে পড়ে…

রিপাবলিকানরা জিতলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানকে ৫ হাজার ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে দেশটির প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার…

মায়ের শেষ বিদায়ে প্যারোলে মুক্তি পেলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস

কারাগারে থাকা সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au