যুক্তরাষ্ট্রে গত ১৩২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম পার হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনো আরও সক্রিয় হয়ে ওঠার মধ্যে ভয়াবহ ‘ডাস্ট বোল’ সময়ের তাপমাত্রার রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে দেশটি। ছবি: NOAA/NCEI।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড রাখা শুরুর পর ১৩২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম পার হয়েছে। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশটির গড় তাপমাত্রা আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে আগস্ট বিশ্বজুড়েও রেকর্ড উষ্ণতার মাস হিসেবে উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) জানিয়েছে, আলাস্কা ও হাওয়াই বাদ দিয়ে মূল ভূখণ্ডের যুক্তরাষ্ট্রে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত গড় তাপমাত্রা ছিল ২৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৩৬ সালের ‘ডাস্ট বোল’ এবং ২০২১ সালের আগের রেকর্ডের তুলনায় এটি প্রায় শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।
শুধু গ্রীষ্ম নয়, আগস্টও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ আগস্ট হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। মাসটিতে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও রেকর্ড ৩১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। এর আগে জুলাই ছিল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ মাস।
NOAA-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি উষ্ণতম গ্রীষ্মের চারটিই ২০২১ সালের পর ঘটেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হয়ে এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা আরও তীব্র করেছে।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির জলবায়ুবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ডেসলার বলেন, বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরেই এমন পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে তাপমাত্রার রেকর্ড আরও ভাঙবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়, বরং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানুষ কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয় সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের গ্রীষ্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল অস্বাভাবিক উষ্ণ রাত। ফলে মানুষ, ভবন ও অবকাঠামো রাতের স্বাভাবিক শীতল হওয়ার সুযোগ কম পেয়েছে।

“আগস্ট ছিল রেকর্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ মাস। ছবি: C3S/ECMWF”
NOAA-এর পর্যবেক্ষণ বিভাগের প্রধান কারিন গ্লিসন বলেন, ১৯৩৬ সালের ডাস্ট বোলের গ্রীষ্মের রেকর্ডকে এবার অল্প ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে, যা রাতের বেলায় তাপ আটকে রাখতে ভূমিকা রাখে।
তীব্র গরমের পাশাপাশি বেড়েছে খরাও। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ এলাকা খরার কবলে ছিল, যা এক মাসে ১০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। আগস্টে টেক্সাস ও ওকলাহোমায় স্বাভাবিকের ৩০ শতাংশেরও কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।
বের্কলি আর্থের জলবায়ুবিজ্ঞানী জেকে হাউসফাদার বলেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই রেকর্ড উষ্ণতা সামঞ্জস্যপূর্ণ। পৃথিবী যত উষ্ণ হচ্ছে, তাপপ্রবাহ তত ঘন ঘন এবং তীব্র হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের উষ্ণ গ্রীষ্ম মানুষের ওপর তাপজনিত চাপ বাড়ায়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় এবং অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড উষ্ণতার পর এবার নজর অস্ট্রেলিয়ার দিকে। দেশটিতে জাতীয়ভাবে তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা শুরুর পর থেকে গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ১ দশমিক ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ২০১৩ সালের পর থেকে অস্ট্রেলিয়ার রেকর্ডে থাকা নয়টি উষ্ণতম বছরের মধ্যে আটটিই ঘটেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম ছিল ২০১৮-১৯ সালে। ওই সময় গড় তাপমাত্রা ১৯৬১-৯০ সালের গড়ের চেয়ে ২ দশমিক ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এর ফলে দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা ও ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।

স্যাটেলাইটে ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর হারিকেন লওয়েল (বামে), হারিকেন কারিনা (মাঝে) ও হারিকেন মেরিকে (ডানে) দেখা যাচ্ছে। ছবি: NOAA/AFP
অস্ট্রেলিয়ার ব্যুরো অব মেটিওরোলজি জানিয়েছে, বর্তমানে শক্তিশালী এল নিনো সক্রিয় রয়েছে এবং বসন্তের শেষভাগ বা গ্রীষ্মে এটি আরও শক্তিশালী হতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ক্রান্তীয় অঞ্চলের দক্ষিণে অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ এলাকায় দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় রাতও তুলনামূলক উষ্ণ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ ও পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে বসন্তে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার সব রাজ্যের কিছু অংশ এবং নর্দার্ন টেরিটরির বিস্তীর্ণ এলাকায় দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে এল নিনো মানেই অস্ট্রেলিয়ায় একই ধরনের আবহাওয়া নিশ্চিত নয়। ভারত মহাসাগরের পরিস্থিতি এবং অস্ট্রেলিয়ার আশপাশের অস্বাভাবিক উষ্ণ সমুদ্রও বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের ওপর প্রভাব ফেলে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনো স্থায়ী থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ।
২০২৬ সালের আগস্ট বিশ্ব ইতিহাসের যৌথভাবে সবচেয়ে উষ্ণ মাস হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বিশ্বের গড় ভূপৃষ্ঠের বায়ুর তাপমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা প্রাক-শিল্প যুগের গড়ের চেয়ে ১ দশমিক ৬৫ ডিগ্রি বেশি। এই তাপমাত্রা ২০২৩ সালের জুলাইয়ের রেকর্ডের সমান।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বৈশ্বিক তাপমাত্রা রেকর্ডের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে ২০২৪ এখনও শীর্ষে। তবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর কারণে চলতি বছর বার্ষিক উষ্ণতার রেকর্ডও চ্যালেঞ্জ করতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এল নিনোর সবচেয়ে বড় তাপমাত্রাগত প্রভাব ২০২৭ সালে দেখা যেতে পারে।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী মাইকেল মান বলেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া ঠেকানো সম্ভব। তাঁর মতে, কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে পারলে পৃথিবীর পৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধিও থামানো সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
সূত্র:নিউজ.কম.এইউ