সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়: শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড -বিচারের নামে প্রতিহিংসার নিষ্ঠুর রূপ

  • 11:04 pm - November 17, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৬৯ বার
শেখ হাসিনা; ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায় কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে সাজানো রাজনৈতিক প্রতিহিংসারই ফল। মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গত এক বছরের কার্যকলাপ, বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ, বিচারকদের পদত্যাগে বাধ্য করা, পুলিশ প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা; সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে একটি কঠোর রায় অপেক্ষা করছে।  এ রায় ঘোষণার আগে ঢাকায় যেভাবে নিরাপত্তা জোরদার করা হল এবং বিচ্ছিন্ন বোমা হামলার ঘটনা ঘটল, তাতে সরকারের আতঙ্কই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এনডি টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ঠিকই বলেছেন যে তাঁকে যে আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে সেটি ছিল একটি জালিয়াতিপূর্ণ, অনির্বাচিত সরকারের প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনাল। বিচারিক স্বাধীনতা যেখানে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায়, সেখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনাই ক্ষীণ। বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনজীবীদের ওপর হামলা, আদালত প্রাঙ্গণে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর উন্মত্ত আচরণ, শত শত নেতাকর্মীর ওপর ধারাবাহিকভাবে মামলা এসবই প্রমাণ করে যে বিষয়টি বিচার নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের একটি কৌশল।

আন্তর্জাতিক মহলও এই বিচারকে যতটা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, ততটাই সন্দেহ প্রকাশ করছে এর স্বচ্ছতা নিয়ে।আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, “হাসিনা এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী।” তাঁর মন্তব্য এই সত্যই তুলে ধরে যে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করতে চাওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে। এমন একজন নেত্রী যিনি এখনো লাখো মানুষের আস্থার প্রতীক, যার দল দেশের জন্মের ইতিহাসের প্রধান শক্তি তাকে আইনের নামে প্রতিহিংসার শিকার করা নিছক বিচার নয়, গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলাকে ভেঙে ফেলার প্রচেষ্টা।

রায় ঘোষণার আগে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ও স্পষ্ট করেছিলেন কী ঘটতে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা জানি রায় কী হবে। রায় টেলিভিশনে দেখানো হবে। তারা তাকে দোষী সাব্যস্ত করবে এবং সম্ভবত মৃত্যুদণ্ড দেবে।” তাঁর এই মন্তব্য প্রমাণ করে বিচারব্যবস্থা কতটা রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং রায় পূর্বপরিকল্পিত ছিল।

এই পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে শেখ হাসিনার সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ‘সাজানো নাটক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে দেশ এখন চরমপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে, যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. ইউনুস। এই বিচার, এই রায় এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক আচরণ মিলিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা যেন দেশকে ধীরে ধীরে একটি পূর্ব পাকিস্তানি দমনব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যেখানে জনগণের কণ্ঠরোধ, বিরোধীদের দমন ও আইনের অপব্যবহারই হয়ে ওঠে রাষ্ট্র পরিচালনার একমাত্র হাতিয়ার।

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, যার সক্রিয় সদস্য দুই কোটি ছাড়িয়েছে। একটি দেশের জন্মদাতা রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করতে গেলে সেই দমন প্রচেষ্টার স্বাভাবিক ফল হবে প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৭১ সালে দমনপীড়ন সফল হয়নি; বাঙালির মেরুদণ্ড ভাঙা যায়নি; গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আকর্ষণ রুদ্ধ হয়নি। আজ আবার সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তির চেষ্টা চলছে, কিন্তু ফলাফল যে ব্যর্থ হবে, তা দেশবাসীর অভিজ্ঞতা থেকেই নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

আজকের বাংলাদেশ বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার সংকটে, মানবাধিকারের চূড়ান্ত বিপন্নতায়, গণতান্ত্রিক কাঠামোর ক্ষয়ে, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড তাই কেবল একজন নেত্রীর বিরুদ্ধে নয়, এটি দেশের জনগণের ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা, আইনের শাসন, এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের বিরুদ্ধে একটি আঘাত।

রাষ্ট্র যদি প্রতিহিংসা দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে স্থিতিশীলতা নয়, বরং অস্থিরতাই হবে তার অনিবার্য পরিণতি। বাংলাদেশ এক ভয়াবহ সড়কে দাঁড়িয়ে। জনতার ইচ্ছাই শেষ কথা যেখানে ক্ষমতার ভয়ে ন্যায়বিচারকে হত্যা করা হয়, সেখানে জনগণ শেষ পর্যন্তই সিদ্ধান্ত নেয় কোন পথ দেশকে বাঁচাবে। যেকোনো রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও সত্য, ন্যায় ও গণতন্ত্রই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে। কারণ দমন যতই প্রবল হোক, মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে কখনোই পরাস্ত করা যায় না।

ড. প্রদীপ রায়, সম্পাদক, ওটিএন বাংলা

এই শাখার আরও খবর

বউকে বাঁচাতে গিয়ে শাশুড়ির মৃত্যু, কটিয়াদীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল দুজনের

মেলবোর্ন,০৬জুন-কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় মর্মান্তিক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় এক গৃহবধূ ও তার শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের উখরাশাল গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরিবারের এক…

ইসরায়েলি রোগীদের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগে দুই নার্সের বিচার ঘিরে নতুন বিতর্ক

মেলবোর্ন, ৫ জুন- অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ব্যাংকসটাউন হাসপাতালের দুই নার্স সারা আবু লেবদেহ ও আহমদ রাশাদ নাদিরের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি রোগীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বহুল আলোচিত মামলার…

আইএসআইএস-সম্পর্কিত নারী জেইনাব আহমদের জামিন শুনানিতে চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্য

মেলবোর্ন, ৫ জুন- আইএসআইএস-সম্পর্কিত দাসত্ব ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নারী জেইনাব আহমদের জামিন শুনানিতে তার চাচা আব্রাহাম আব্বাস সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএসকে ‘অশুভ’ বলে তীব্র…

বিমানবন্দরে বিমান ছিনতাইচেষ্টার অভিযুক্ত কিশোর অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে চেয়েছিল: আদালত

মেলবোর্ন, ৫ জুন- অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের অ্যাভালন বিমানবন্দরে জেটস্টার এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ছিনতাইয়ের চেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত এক কিশোর দেশ ছাড়ার উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে…

টাঙ্গাইলে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ

মেলবোর্ন, ৫ জুন- টাঙ্গাইলের গোপালপুর ও ভূঞাপুর উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন…

ওয়ান নেশনের জনপ্রিয়তা বাড়ায় কর সংস্কারে এগিয়েছে সরকার: অ্যান্থনি আলবানিজ

মেলবোর্ন, ৫ জুন- অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ স্বীকার করেছেন, দেশটির ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ওয়ান নেশনের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা তাঁর সরকারের বিতর্কিত কর সংস্কার উদ্যোগের পেছনে অন্যতম…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au