মেলবোর্ন, ১৬ ডিসেম্বর- ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিন। এই দিনটি কেবল একটি সামরিক বিজয়ের স্মারক নয়; এটি আত্মত্যাগ, সাহস ও মানবিক মর্যাদার পুনর্জন্ম। মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং অসংখ্য নারী-পুরুষ-শিশুর ত্যাগে অর্জিত এই বিজয় আমাদের কৃতজ্ঞতা ও আত্মসমালোচনার দিন-যাতে আমরা অতীতের শিক্ষা নিয়ে একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণে এগোতে পারি।
এ বছরের বিজয় দিবস বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বেদনাদায়ক হলো, আজ বিজয় দিবসকে ঘিরে ‘নতুন ইতিহাস’ শোনার চাপ তৈরি করা হচ্ছে-যেখানে ১৯৭১-এর অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা দেখা যায়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি প্রমাণ করতে চায় যে ‘৭১ বলে কিছু ছিল না’।
এটি কেবল ইতিহাস বিকৃতি নয়; এটি শহীদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী গঠিত হয়। এরা ছিল দখলদার বাহিনীর স্থানীয় সহচর-যাদের কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি, ধরপাকড়, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালানো। আল-বদর ও আল-শামস বিশেষভাবে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী নিধনে যুক্ত ছিল-শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের হত্যা করে জাতিকে মেধাশূন্য করার ঘৃণ্য প্রচেষ্টা চালায়।
১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এই সংগঠিত অপরাধের চূড়ান্ত উদাহরণ। এই সময় নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান ও ওয়াশিংটন পোস্ট একাধিক প্রতিবেদনে রাজাকার বাহিনীর সহায়তায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গ্রাম পোড়ানো, ধর্ষণ ও হত্যা অভিযানের কথা প্রকাশ করে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ শীর্ষ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো সেই সময় শরণার্থী স্রোত, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড এবং বুদ্ধিজীবী নিধনের তথ্য তুলে ধরেছে। বিদেশি সাংবাদিকদের মাঠপর্যায়ের রিপোর্ট, কূটনৈতিক তারবার্তা এবং মানবাধিকার সংগঠনের নথিপত্র-সবই এক সুরে কথা বলে: ১৯৭১ ছিল গণহত্যা ও স্বাধীনতার লড়াইয়ের বছর, আর রাজাকার-আলবদর-আলশামস ছিল সেই অপরাধযজ্ঞের সক্রিয় অংশীদার।
ইতিহাসকে অস্বীকার করে কোনো জাতি এগোয় না। সত্যকে মুছে ফেলার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে। বিজয় দিবস আমাদের শেখায়-স্বাধীনতা কেবল অর্জনের নয়, রক্ষারও। আজকের বাংলাদেশে প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র পরিচালনা-যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু ইতিহাস বিকৃতি নয়; রাজনীতি থাকবে, কিন্তু ঘৃণা ও অস্বীকার নয়; ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু জবাবদিহির বাইরে নয়।
এই বিজয় দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক-১৯৭১-এর সত্যকে রক্ষা করব, শহীদদের সম্মান করব, এবং একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের পথে নির্ভীকভাবে এগোব। কারণ বিজয় কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি ভবিষ্যতের দায়।