বাংলাদেশ

মতামত: কেন বাংলাদেশের সঙ্গে সব সংযোগ ভেঙে ফেলা ভারতের জন্য বিপজ্জনক

  • 10:37 pm - January 14, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৭০ বার
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে।

মেলবোর্ন, ১৪ জানুয়ারি: আজ আমরা যে বিশ্ব দেখছি, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় উগ্রতা ভয়াবহভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। পরিচয়, ধর্ম ও জাতীয়তার নামে ঘৃণা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে এবং তা ক্রমেই সহিংস রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তার, কিংবা বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও বাড়িঘর পোড়ানো এই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এসব ঘটনা বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে আবারও মানবাধিকার, সহিংসতা ও নৈতিকতার প্রশ্নকে টেনে এনেছে।

এই প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়াকেও ছাড়েনি। বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ পুরো অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী রাজনীতি সমাজ ও রাষ্ট্রকে গভীরভাবে গ্রাস করেছে। বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং একজন হিন্দু সংবাদপত্র সম্পাদকের হত্যাকাণ্ড এই উদ্বেগ আরও তীব্র করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতের একাংশ জনমত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলা শুরু করেছে। এই মনোভাব দ্রুত ক্রীড়াক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে, যখন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আইপিএলে খেলা এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে দল থেকে বাদ দিতে বাধ্য করে।

এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাংলাদেশি ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরানোর অনুরোধ জানায় এবং বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধের ঘোষণাও আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী ও ঘৃণামূলক ভাষা ব্যবহার শুরু হয়। দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষ ক্রমেই বাড়ছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

ভৌগোলিকভাবে ভারত চারদিকে পাকিস্তান, চীন, নেপাল ও বাংলাদেশ দ্বারা বেষ্টিত, আর দক্ষিণে শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো দ্বীপদেশ। এই অঞ্চলে যদি ভারত নিজেকে সব প্রতিবেশীর কাছে শত্রু হিসেবে দাঁড় করায়, তাহলে তা কৌশলগতভাবে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করবে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ভারতের বন্ধু ছিল এবং ভারতও তাকে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উগ্রতা ও সাম্প্রদায়িকতার কারণে সম্পর্ক সংকটে পড়ছে। তার চেয়েও উদ্বেগজনক হলো, ভারতের কিছু প্রতিক্রিয়া এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

ভারতের উচিত বোঝা, এই ধরনের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করে। আইপিএল থেকে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের বাদ দেওয়া বা ক্রীড়াক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে কি সত্যিই বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বাড়বে? বাস্তবে এগুলো উল্টো তাদের ঝুঁকিই বাড়াতে পারে।

ভারত যদি ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘উন্নত ভারত’ হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তবে তাকে অন্তত কিছু প্রতিবেশীর সঙ্গে কার্যকর ও স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যখন এমনিতেই টানাপোড়েনপূর্ণ, তখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা আত্মঘাতী হবে। ভারত কি এমন এক ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত, যেখানে তার কোনো ভালো প্রতিবেশী থাকবে না?

এই জায়গাতেই ভারতের সরকারকে সংযত ও কূটনৈতিক হতে হবে। ভারতকে অবশ্যই বাংলাদেশকে হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় চাপ দিতে হবে, কিন্তু সেটা হতে হবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে, ব্ল্যাকমেইল, সাংস্কৃতিক বয়কট বা বর্ণবাদী বক্তব্যের মাধ্যমে নয়। একবার যদি বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে যায়, তাহলে সেই ভাঙা বিশ্বাস পুনর্গঠন করা কঠিন হয়ে যাবে। একই সঙ্গে তা চীন, পাকিস্তান ও এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ভারতকে কৌশলগতভাবে ঘিরে ধরার সুযোগ করে দেবে।

ভারতের শক্তি আসবে ধৈর্য, কূটনীতি ও সংযম থেকে, সব বন্ধন ছিন্ন করা থেকে নয়। যদি ভারত সত্যিই এই অঞ্চলে প্রভাবশালী ও দায়িত্বশীল শক্তি হতে চায়, তবে তাকে আবেগ নয়, দূরদর্শিতা দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

মতামত | পবন কুমার |

পবন কুমার
সহকারী অধ্যাপক, গ্লোবাল স্টাডিজ
ড. বি আর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি

অনুবাদ: ওটিএন বাংলা

এই শাখার আরও খবর

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…

বিএনপি নেতাদের অভিনন্দন জানালেন ৩ উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তত তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au