বিশ্ব

দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর পাড় করলেন ট্রাম্প: যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতা

  • 6:16 am - January 21, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৩৬ বার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২১ জানুয়ারি- মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার এক বছর পূর্ণ করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই এক বছরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামো যেমন বদলে দিয়েছেন, তেমনি বিশ্ব রাজনীতিতেও বড় ধরনের চাপ ও অস্থিরতা তৈরি করেছেন। মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ানো, সামরিক হস্তক্ষেপ, শুল্ক যুদ্ধের হুমকি এবং বিতর্কিত পররাষ্ট্রনীতি এই এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

ক্ষমতায় ফেরার প্রথম বছর উপলক্ষে ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, তার নেতৃত্ব না থাকলে উত্তর আটলান্টিক জোট ন্যাটো আজ আর টিকে থাকত না। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ন্যাটোর জন্য তার চেয়ে বেশি কেউ কাজ করেনি। তিনি না এলে ন্যাটো ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যেত বলেও মন্তব্য করেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: ডাগ মিলস / দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

এই বক্তব্যের পাশাপাশি নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান। তিনি বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টার সঙ্গে তার নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার হতাশার সম্পর্ক রয়েছে। তার ভাষায়, এখন তিনি আর শুধু শান্তির কথা ভাবেন না। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে ফের শুল্ক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার মধ্যেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সরাসরি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার ঘোষণা দেন। গ্রিনল্যান্ড দখলের ইঙ্গিত এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রকাশ করায় এই ব্রিফিং ঘিরে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়।

দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে ট্রাম্প যে পরিমাণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে খুব কম প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। এই সময়ে তিনি ২২৫টির বেশি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন, দিয়েছেন ১ হাজার ৭৪০টির বেশি ক্ষমা বা দণ্ড লাঘবের সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে অন্তত সাতটি বিদেশি দেশে সামরিক হামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, আর আন্তর্জাতিক জলসীমায় হয়েছে আরও ৩৫টির বেশি অভিযান।

ভেনেজুয়েলার শাসকগোষ্ঠী জনপ্রিয় না হলেও তাদের নেতাকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এভাবে আটক করা একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে।
(ABC News: Lindsay Dunbar)

মার্কিন প্রেসিডেন্সির ইতিহাসবিদ রাসেল রাইলি বলেন, ট্রাম্পের কৌশল যেন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরনো ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা। যারা মনে করেন বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো অকার্যকর বা দুর্নীতিগ্রস্ত, তাদের কাছে এই কৌশল আকর্ষণীয়। তিনি একে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কার সেই কথার সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে বলা হয়েছিল, গ্রাম বাঁচাতে হলে গ্রাম ধ্বংস করতে হয়।

ট্রাম্পের সামরিক নীতির বিষয়ে মার্কিন জনমতও বেশ বিভক্ত। এপি-নর্ক পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন, ট্রাম্প বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন। রিপাবলিকানদের বড় অংশ অবশ্য তার অবস্থানকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র ভোটারদের বড় অংশই এই নীতির বিরোধিতা করেছেন। জরিপে আরও দেখা যায়, প্রায় ৪৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক চান যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে কম সক্রিয় ভূমিকা নিক।

মার–এ–লাগোর সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অন্যান্যরা। ছবি: এএফপি

দেশের ভেতরেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ জোরালো হয়েছে। নিউ জার্সির নবনির্বাচিত গভর্নর মিকি শেরিল শপথ অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের সমালোচনা করে তাকে ব্রিটিশ শাসক রাজা তৃতীয় জর্জের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ এবং জনগণের সম্মতি ছাড়াই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতায় ট্রাম্পের সঙ্গে সেই সময়ের শাসকের মিল রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ট্রাম্প প্রশাসনের তৎপরতা নজরে পড়ছে। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকে ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ দূতদের উপস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক চাপানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, ইউরোপ পাল্টা শুল্ক আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্রও একই পথে হাঁটবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ড কেনা নিয়ে শুল্ক চাপানোর চেষ্টা করে, তাহলে ইউরোপের বাজারে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে।

২৮ অক্টোবর জাপানে মার্কিন নৌবাহিনীর ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন বিমানবাহী রণতরীতে বক্তৃতা দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাচছেন। ছবি : এএফপি

ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিন যুক্তরাষ্ট্রে এক নতুন স্বর্ণযুগের সূচনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এক বছর পর দেখা যাচ্ছে, সত্যিই বড় পরিবর্তনের ঢেউ দেশটিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই সময়ে ফেডারেল সরকারের আকার ছোট করার অংশ হিসেবে তিন লাখের বেশি সরকারি কর্মচারী চাকরি ছেড়েছেন।

তবে ইতিহাসবিদরা সতর্ক করছেন, এত দ্রুত ও বড় পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনই বোঝা যাবে না। এর ফল ভালো না খারাপ, তা জানতে আরও সময় লাগবে।

প্রথমে নথিতে স্বাক্ষর করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ছবিঃ রয়টার্স

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রহ থাকলেও মার্কিন জনগণের মধ্যে এ নিয়ে তেমন সমর্থন নেই। ইউগভের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৮ শতাংশ মানুষ গ্রিনল্যান্ড কেনার পক্ষে, আর ৪৫ শতাংশ এর বিরোধিতা করছেন। সামরিক শক্তি ব্যবহার করে গ্রিনল্যান্ড দখলের ধারণা তো আরও বেশি অজনপ্রিয়। জরিপ অনুযায়ী, ৭৩ শতাংশ মানুষ এই প্রস্তাবের বিরোধী।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব রাজনীতিতে এক অস্থির ও বিতর্কপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকছে।

সূত্রঃ আল জাজিরা

এই শাখার আরও খবর

বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে ইহুদিবিদ্বেষের হুমকি অবমূল্যায়িত হয়েছিল: মাইক বার্জেস

সিডনি: বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষের ভয়াবহতা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) মহাপরিচালক মাইক…

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au