নতুন সর্বোচ্চ নেতার নির্বাচন তেহরানে উদযাপনে হাজারো মানুষ
মেলবোর্ন, ১০ মার্চ- ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনি-র নিয়োগকে ঘিরে রাজধানী তেহরান-এ সমর্থকদের বড় সমাবেশ দেখা গেছে। নতুন নেতার প্রতি সমর্থন জানাতে হাজারো…
মেলবোর্ন, ২৪ জানুয়ারি- সাদা বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকা- যেখানে আকাশ আর ভূমির পার্থক্য মুছে যায়, নীরবতা রাজত্ব করে। সেই নিঃশব্দ সৌন্দর্য দেখতেই একদল মানুষ পাড়ি দিয়েছিলেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে। কিন্তু সেই স্বপ্নের যাত্রাই রূপ নেয় এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে, যা আজও নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে গভীর ক্ষতের মতো রয়ে গেছে।
১৯৭৯ সালের ২৮ নভেম্বর। এয়ার নিউজিল্যান্ডের ফ্লাইট টিই-৯০১ অ্যান্টার্কটিকার সর্বোচ্চ সক্রিয় আগ্নেয়গিরি মাউন্ট এরেবাসে আছড়ে পড়ে। প্লেনে থাকা ২৫৭ জন যাত্রী ও ক্রু- কেউই বেঁচে ফেরেননি।
স্বপ্নের ভ্রমণ, ভয়াল পরিণতি
১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে অ্যান্টার্কটিকা দর্শন ছিল বিরল ও আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা। এয়ার নিউজিল্যান্ড ১৯৭৭ সালে চালু করে বিশেষ দর্শনমূলক ফ্লাইট। প্রায় ১১ ঘণ্টার এই যাত্রায় যাত্রীদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো বরফে ঢাকা মহাদেশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, ছবি তোলার সুযোগ এবং বিশেষজ্ঞদের বর্ণনা।
ফ্লাইট টিই-৯০১ ছিল এমনই একটি জনপ্রিয় দর্শনভিত্তিক যাত্রা। সেদিন প্লেনে ছিলেন ২৩৭ জন যাত্রী ও ২০ জন ক্রু সদস্য- পরিবার, দম্পতি, তরুণ-তরুণী ও প্রবীণরা; অনেকের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ভ্রমণ হওয়ার কথা ছিল এটি।
নীরবে বদলে যাওয়া পথ
সেদিনের পাইলট ক্যাপ্টেন জিম কলিন্স ও ফার্স্ট অফিসার গ্রেগ ক্যাসিন আগে কখনো এই রুটে উড়েননি, তবে তাদের প্রয়োজনীয় ব্রিফিং দেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্লেনের ম্যাকমার্ডো সাউন্ডের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার কথা ছিল- যেখানে সমতল বরফ ও পানি রয়েছে।
কিন্তু যাত্রার আগে ঘটে যায় এক মারাত্মক ভুল। এয়ার নিউজিল্যান্ডের নেভিগেশন সেন্টার দুটি স্থানাঙ্কে সামান্য পরিবর্তন আনে। কর্মকর্তারা একে ছোট সংশোধন ভাবলেও এর ফলে ফ্লাইটপাথ সরে যায় প্রায় ৩১ মাইল পূর্ব দিকে। এর মানে, প্লেনটি এখন আর সমতল বরফের ওপর নয়- সোজা এগোচ্ছে রস আইল্যান্ডের দিকে, যেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মাউন্ট এরেবাস। এই পরিবর্তনের কথা পাইলটদের জানানো হয়নি।
বরফের বিভ্রম
অ্যান্টার্কটিকার আকাশে প্রবেশের পর পাইলটরা যাত্রীদের ভালো দৃশ্য দেখানোর জন্য প্লেন নামান প্রায় ২ হাজার ফুট উচ্চতায়। এমনটা দর্শনমূলক ফ্লাইটে অস্বাভাবিক ছিল না। কেবিনে যাত্রীরা ব্যস্ত ছিলেন ছবি তোলা আর ভিডিও ধারণে। কিন্তু প্রকৃতি তখন তৈরি করছিল এক ভয়ংকর ফাঁদ-‘হোয়াইটআউট’।
হোয়াইটআউট এমন এক আবহাওয়াজনিত বিভ্রম, যেখানে তুষারঢাকা ভূমি আর মেঘলা আকাশের আলো একসঙ্গে মিশে গিয়ে গভীরতা বোঝার ক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। চোখে মনে হয় সামনে সমতল সাদা প্রান্তর, অথচ বাস্তবে সেটি হতে পারে পাহাড়ের ঢাল।
পাইলটদের চোখে যে সাদা পটভূমি ধরা পড়ছিল, তা ছিল মাউন্ট এরেবাসের বরফাচ্ছাদিত গা- আকাশের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে বিপদ বোঝার কোনো সুযোগই ছিল না।
শেষ ছয় সেকেন্ড
দুপুর প্রায় ১টা। হঠাৎ প্লেনের প্রোক্সিমিটি ওয়ার্নিং সিস্টেম সতর্ক সংকেত দেয়। মাত্র ছয় সেকেন্ড- তারপরই সম্পূর্ণ গতিতে প্লেনটি আগ্নেয়গিরির গায়ে আছড়ে পড়ে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মুহূর্তেই। পরে উদ্ধারকারী দল পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায়। কেউ বেঁচে ছিলেন না।
প্লেন দুর্ঘটনা ও একটি জাতির শোক
এই দুর্ঘটনা নিউজিল্যান্ডকে নাড়িয়ে দেয়। তখন দেশটির জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ লাখ। বলা হতো, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল- যিনি কোনো না কোনোভাবে এই দুর্ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নন।
দীর্ঘ তদন্তে উঠে আসে ভুল নেভিগেশন তথ্য, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানবিক ভুলের চিত্র। প্রাথমিকভাবে পাইলটদের দায়ী করা হলেও পরবর্তীতে জানা যায়- তারা আসলে একটি সিস্টেমগত ব্যর্থতার শিকার ছিলেন।
ইতিহাসের শিক্ষা
আজকের আধুনিক বিমানে স্যাটেলাইটভিত্তিক নেভিগেশন, উন্নত টেরেইন ওয়ার্নিং সিস্টেম এবং স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্লাইট টিই-৯০১-এর মতো দুর্ঘটনা আজ প্রায় অসম্ভব। তবুও, মাউন্ট এরেবাস ট্র্যাজেডি স্মরণ করিয়ে দেয়- প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, ছোট ভুল আর প্রকৃতির বিভ্রম একত্র হলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
৪৭ বছর পরও সেই সাদা বরফের নিচে চাপা পড়ে আছে ২৫৭টি জীবন, আর মানব ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়।
সূত্র: এনডিটিভি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au