আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ৩ ফেব্রুয়ারি- বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচার যত এগোচ্ছে, ততই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। চাকরি, নগদ সহায়তা, সুদমুক্ত ঋণ, সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা। সব মিলিয়ে ভোটারদের, বিশেষ করে তরুণদের মন জয়ের চেষ্টা করছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো। তবে বিশ্লেষক ও সাধারণ ভোটারদের প্রশ্ন একটাই, এই প্রতিশ্রুতিগুলো কি আদৌ বাস্তবায়নযোগ্য, নাকি এগুলো শুধু নির্বাচনী ভাষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
২৭ বছর বয়সী মোহাইমিনুল রাফি গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার ভাষায়, সরকারি প্রথম শ্রেণির চাকরি এখনো নিরাপদ জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি শুনছেন, বেকারদের জন্য নগদ সহায়তা, সুদমুক্ত ঋণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, এগুলো সহায়তা করলে ভালোই হবে। তবে তার মতে, আসল প্রয়োজন হলো একটি সুস্থ চাকরির বাজার এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগব্যবস্থা।
রাফি ছিলেন ২০২৪ সালের সেই তরুণদের একজন, যারা সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলনে অংশ নেন। ওই আন্দোলন পরে দেশজুড়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। সেই ঘটনার পর বাংলাদেশ এখন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত একটি জোটের মধ্যে। জামায়াত এই জোটে কিছু উদারপন্থী মিত্রকেও যুক্ত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি। প্রচারের শেষ পর্যায়ে দুই পক্ষের শীর্ষ নেতারা দেশজুড়ে সভা, সমাবেশ ও গণসংযোগে ব্যস্ত। মঞ্চ থেকে শুরু করে ঘরে ঘরে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা বারবার একই উদ্বেগগুলো তুলে ধরছেন চাকরি, নিত্যপণ্যের দাম কমানো, কর ছাড়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিশ্রুতি মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এগুলোর বড় অংশ বাস্তবায়ন করা যে কোনো সরকারের জন্য কঠিন হবে। রাফির কথায়, সবাই এমনভাবে চাকরি ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যেন রাতারাতি সুইচ অন করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশে। কোভিড-পূর্ব ২০১৯ সালে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ শতাংশের বেশি। দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্যপণ্যের দাম ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২ থেকে ২৩ শতাংশে আটকে আছে। কর আদায় ও জিডিপির অনুপাত এখনো ৭ শতাংশের নিচে, যেখানে ভারতে তা প্রায় ১২ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১০ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি রাষ্ট্রের মৌলিক সেবা টেকসইভাবে চালাতে এই হার অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া দরকার।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে কিছুটা স্থিতিশীলতা এনেছে। তবে তিনি মনে করেন, এই সরকার পরিবার পর্যায়ের অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যবসা খাতের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি। তার মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট ও স্থবির মজুরি বর্তমান অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। বিনিয়োগ না বাড়ার পেছনে ব্যবসায়ীদের আস্থাহীনতাই বড় কারণ।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন না। তার ভাষায়, বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি নতুন সূচনা দরকার, আর নির্বাচন সেই সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে, তবে নাটকীয় উন্নতি আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
এই উত্তপ্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াত উভয়েই নানা প্রতিশ্রুতি সামনে আনছে। যদিও এখনো পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ হয়নি, তবে ঢাকায় আয়োজিত বিভিন্ন বড় অনুষ্ঠানে ঘোষিত নীতিগুলোই এখন প্রচারের মূল হাতিয়ার।
বিএনপির সবচেয়ে আলোচিত প্রতিশ্রুতি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। এই কার্ড পরিবারের নারীর নামে ইস্যু করা হবে। প্রাথমিকভাবে ৪০ লাখ পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি পরিবার মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা পাবে অথবা নির্ধারিত দোকান থেকে চাল, ডাল, তেল ও লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি প্যাকেট নিতে পারবে। বিএনপির নেতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি মানুষের ওপর বিনিয়োগে বিশ্বাস করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কারুশিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্পে ঋণ সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরিই তাদের লক্ষ্য।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই কর্মসূচির ব্যয় বহন করাই বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বাংলাদেশ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বছরে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সারা দেশে বাস্তবায়ন করলে বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা লাগবে। অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ দিয়ে মানসম্মত সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না, বরং কারা এই সুবিধা পাবে তা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করাই আসল চ্যালেঞ্জ।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রধান কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি হলো ‘স্মার্ট সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড’। এই কার্ড জাতীয় পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা, করব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে একীভূত করবে। জামায়াতের পরিকল্পনায় যুক্ত সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোকররম হোসেন বলেন, তাদের লক্ষ্য নগদ টাকা বিতরণ নয়, বরং একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে সেবা সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং অপচয় কমে।
তরুণ ভোটারদের আকর্ষণ করতে দুই পক্ষই বড় অঙ্কের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কলেজপড়ুয়া ও স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ। মোট বেকার মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ।
বিএনপি ১৮ মাসের মধ্যে ১ কোটি চাকরি সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষিত বেকারদের আর্থিক সহায়তা, মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে ৮ লাখ আইটি চাকরির কথা বলছে। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালুর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি, যাতে ফ্রিল্যান্সাররা সহজে বৈদেশিক আয়ে যুক্ত হতে পারেন।
জামায়াতের পরিকল্পনায় রয়েছে পাঁচ বছরে ১ কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, প্রতিটি উপজেলায় যুব প্রযুক্তি ল্যাব স্থাপন এবং জেলা পর্যায়ে চাকরি ব্যাংক গঠন। তারা ৫ লাখ উদ্যোক্তা ও ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরির কথাও বলছে। পাশাপাশি বেকার স্নাতকদের জন্য মাসে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণের প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এত বড় পরিসরে চাকরি সৃষ্টি করতে হলে টানা কয়েক বছর ৮ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ব্যাপক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। সুদমুক্ত ঋণকে তারা জনপ্রিয়তামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, যার দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
শিক্ষা খাতেও বড় প্রতিশ্রুতি এসেছে। বিএনপি ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্প, কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, মিড-ডে মিল সম্প্রসারণ এবং তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ চালুর কথা বলছে। জামায়াত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ, বিদেশে পড়াশোনার জন্য বাছাইকৃত শিক্ষার্থীদের পূর্ণ সহায়তা এবং বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের।
কর ও রাজস্ব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। জামায়াত কর্পোরেট কর ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের দাবি, কর আদায় ব্যবস্থার দুর্নীতি ও ফাঁক বন্ধ করলে অতিরিক্ত কয়েক লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা নয়, বরং এই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছে- পরবর্তী সরকার কি বাস্তবে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে। রাফির কথায়, প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ। কিন্তু যদি চাঁদাবাজি, ঘুষ আর পক্ষপাতের সংস্কৃতি না বদলায়, তাহলে দেশ আবার আগের জায়গাতেই ফিরে যাবে।
লেখকঃ মেহেদী হাসান মারুফ, আল জাজিরা
অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au