মেলবোর্ন ৭ ফেব্রুয়ারি- আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। জাকার্তার প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে অনুষ্ঠিত আনুষ্ঠানিক এক অনুষ্ঠানে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন তিনি। অস্ট্রেলীয় সরকার একে গত তিন দশকে দুই দেশের মধ্যে নেওয়া সবচেয়ে বড় যৌথ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
চুক্তির আওতায় দুই দেশ নিরাপত্তা ইস্যুতে নিয়মিত পরামর্শ চালানো এবং কোনও পক্ষ হুমকির মুখে পড়লে যৌথ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, চুক্তিটির বাস্তব সামরিক প্রভাব সীমিত হতে পারে এবং এর গুরুত্ব অনেকটাই প্রতীকী।
অস্ট্রেলীয় সরকারের প্রকাশিত চূড়ান্ত নথি অনুযায়ী, এই চুক্তিটি মূলত ১৯৯৫ সালে স্বাক্ষরিত অস্ট্রেলিয়া-ইন্দোনেশিয়া নিরাপত্তা চুক্তির অনুরূপ। ওই চুক্তিটি পরে পূর্ব তিমুরে অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্বে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের ঘটনায় ইন্দোনেশিয়া বাতিল করে দিয়েছিল।
নতুন চুক্তিতেও বলা হয়েছে, দুই দেশ ‘যৌথ নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে এমন বিষয়’ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করবে এবং ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও বৃহত্তর অঞ্চলের স্বার্থে সহযোগিতা জোরদার করবে। নিরাপত্তা ক্ষেত্রে ‘পারস্পরিক উপকারে আসে এমন’ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও এতে রয়েছে।
চুক্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দুই দেশের কোনও একটির যৌথ নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে ‘প্রতিকূল চ্যালেঞ্জ’ দেখা দিলে উভয় পক্ষ পরামর্শ করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এককভাবে বা যৌথভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা বিবেচনা করবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ একে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য একটি ‘মাইলফলক মুহূর্ত’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং বলেন, এটি ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ককে একটি নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এর আগে গত নভেম্বরে সিডনির উপকূলে চুক্তিটি নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর সময়ও তিনি এটিকে সম্পর্কের ‘নতুন যুগ’-এর সূচনা বলেছিলেন।
তবে সব বিশ্লেষক এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন। তাঁদের মতে, চুক্তিতে কোন নির্দিষ্ট যৌথ নিরাপত্তা হুমকির কথা বলা হয়েছে বা বাস্তবে কী ধরনের সামরিক সহযোগিতা হতে পারে, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্টতা নেই।
অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো বলেন, এই চুক্তি দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় বাস্তব অবদান রাখার প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া পাশাপাশি বসবাস করবেই এবং এই সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা ও সদিচ্ছার ভিত্তিতে গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রাবোও আরও বলেন, ইন্দোনেশিয়া সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায় এবং কোনও শত্রু তৈরি করতে চায় না। তাঁর মতে, এই চুক্তি অঞ্চলজুড়ে স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠবে।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য। তাঁর ভাষায়, গত ৩০ বছরে দুই দেশ একসঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে এটি সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এমেরিটাস অধ্যাপক গ্রেগ ফিলি বলেন, চুক্তিটি দুই নেতার মধ্যে ভালো ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশেষ করে কোনও সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্রে এই চুক্তি থেকে অস্ট্রেলিয়া বাস্তবে কতটা সুবিধা পাবে, সে বিষয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।
প্রাবোও সুবিয়ান্তোর বহুমুখী কূটনীতিও আলোচনায় এসেছে। তিনি সম্প্রতি ব্রিকস জোটে ইন্দোনেশিয়ার যোগদানের পর ২০২৫ সালের সম্মেলনে অংশ নেন এবং গত বছর চীনে আয়োজিত এক সামরিক কুচকাওয়াজে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক সুজান্না প্যাটন বলেন, চুক্তিটি ইতিবাচক হলেও এটিকে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে বড় কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তাঁর মতে, ইন্দোনেশিয়া এখনও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে।
ইন্দোনেশিয়ার কিছু পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকও চুক্তিটি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া ও পাপুয়া নিউগিনির মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রেক্ষাপটে এর বাস্তব তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিম পাপুয়ায় ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে এই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি দুই নেতা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান দ্রুত শক্তিশালী হওয়ায় এসব বিষয় দেশটির জন্য বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।