মেলবোর্ন, ১০ ফেব্রুয়ারি- বাংলাদেশ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ‘বিতর্কিত’ এত জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। যা দেশটির ভঙ্গুর গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বলে মনে করা হচ্ছে। সহিংস ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে সময় সামরিক হেলিকপ্টারে ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
চলমান ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রমের মধ্যেই ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এ সিদ্ধান্তকে দেশে ও বিদেশে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দেখা হচ্ছে।
ইতিহাস বলছে, ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মাত্র ৬২টি আসন পেলেও মোট ভোটের ৪০ শতাংশের বেশি পেয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও, স্থানীয় বার কাউন্সিল নির্বাচনে জয় পেয়ে আওয়ামী লীগ তার সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দেয়। তবে নিষেধাজ্ঞার ফলে দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।
ভয়েস অব আমেরিকার একটি স্বাধীন জরিপে দেখা যায়, ৫৭ শতাংশ বাংলাদেশি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরাকে সমর্থন করেন। এই তথ্য নির্বাহী আদেশে দল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আওয়ামী লীগের মতো বড় ধর্মনিরপেক্ষ দল নির্বাচনের বাইরে থাকায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন মূলত বিএনপি ও ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এতে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো একটি পুরোপুরি ধর্মীয় ঝোঁকসম্পন্ন নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে গণপরিষদ গণভোটের প্রচারণা স্বার্থের সংঘাত ও ভোট ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উসকে দিয়েছে। জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন ও অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে নির্বাচন আয়োজনের আইনগত ভিত্তি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদনও হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে একটি ‘স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ’ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে ২০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের ‘ব্যালট প্রকল্পে’ সহায়তার ঘোষণা দেয়। সামরিক-সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ঢাকায় অস্ট্রেলিয়া একটি নতুন হোম অ্যাফেয়ার্স অফিসও চালু করে।
জুলাইয়ের সহিংসতার পরও অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী গ্রহণ বাড়ায় এবং শিক্ষার্থী ভিসার ক্যাটাগরি লেভেল ১-এ উন্নীত করে। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গুরুতর স্বচ্ছতা-সংক্রান্ত অভিযোগের কারণে বাংলাদেশকে আবার উচ্চঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ৩-এ নামিয়ে আনা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য দপ্তরের (ডিএফএটি) বাংলাদেশবিষয়ক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মানবাধিকার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ কর্মীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অন্তর্বর্তী সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহারের কড়া সমালোচনা করে একে দমনমূলক বলে অভিহিত করেছে। ২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রমে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারির পর সভা, প্রকাশনা এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টও নিষিদ্ধ করা হয়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্প মেয়াদের শাসনে বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সাংবাদিক নিপীড়নের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ওধিকার জানায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ২৮১ জন নিহত হয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম জামাল উদ্দিন বলেন, প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তার মতে, বড় দলগুলোকে নিষিদ্ধ রেখে আয়োজন করা নির্বাচন একপেশে ও অগণতান্ত্রিক হওয়ার ঝুঁকি বহন করছে।
প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মানবাধিকার কর্মীরাও অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর এমন নির্বাচনে অর্থায়নকে একটি বিপজ্জনক নজির হিসেবে দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কয়েকজন আইনপ্রণেতা ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং আসন্ন নির্বাচনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট, রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে কোনো নির্বাচন হলে তা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।