বাংলাদেশ

আমার মেয়ের মৃত্যুর দায় কে নেবে: আট বছরের শিশুকন্যার বাবা

  • 7:02 pm - June 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৪ বার
আমার মেয়ের মৃত্যুর দায় কে নেবে: আট বছরের শিশুকন্যার বাবা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৬ জুন- মিরপুরে নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যার শিকার আট বছরের শিশুকন্যার বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রশ্ন তুলেছেন, তার মেয়ের মৃত্যুর দায় কে নেবে। তিনি বলেছেন, তিনি একজন ধর্ষিতার বাবা কিংবা খণ্ডিত লাশের বাবা হিসেবে পরিচিত হতে চাননি, বরং একজন গর্বিত পিতা হয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন। শনিবার রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত হয়ে আবেগঘন বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিএনপির উদ্যোগে গঠিত ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্যসহায়তা সেল’ এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। সেখানে নিজের মেয়েকে হারানোর বেদনা তুলে ধরে শিশুটির বাবা বলেন, “আমি একজন ধর্ষিতার বাবা, একজন খণ্ডিত লাশের বাবা। কিন্তু আমি তো এভাবে পরিচিত হতে চাইনি। আমি গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম।”

‘আমার মেয়ের মৃত্যুর দায় কার?’

বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, তার মেয়ের নির্মম পরিণতির দায় কার ওপর বর্তাবে। এটি কি একজন বাবার অবহেলা, সমাজের ব্যর্থতা, নাকি রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতার ফল, সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি জানতে চান।

তিনি বলেন, “আমি জানতে চাই, এই দায় কে নেবে? এই দায় কি আমার অবহেলা, সমাজের অবহেলা, না রাষ্ট্রের অবহেলা? আজকে আমার খুকুর খণ্ডবিখণ্ড লাশের দায় কে নেবে? আমি কি তার জন্য দায়ী? নাকি অন্য কেউ দায়ী?”

‘আমাকে আমার সম্মান ফিরিয়ে দিন’

গোলটেবিলে উপস্থিত অতিথি, নীতিনির্ধারক ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি হাত জোড় করে আবেদন জানান এই শোকাহত বাবা।

তিনি বলেন, “আমি একজন ধর্ষিতার বাবা হয়ে থাকতে চাই না। আমি তো একজন গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছি। আপনারা আমাকে সেই নাম ফিরিয়ে দেন, আমাকে সেই সম্মান ফিরিয়ে দেন।”

তার কণ্ঠে তখন গভীর বেদনা আর অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, যদি তার হারিয়ে যাওয়া সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আর কোনো বাবা-মাকে সন্তানের এমন নির্মম পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে না।

“যদি তা না পারেন, তাহলে এমন একটি সমাজব্যবস্থা দিন, যেখানে আর কোনো বাবা-মায়ের বুক খালি হবে না। কোনো বাবা-মায়ের সারাজীবনের কান্নার পথ খুলে যাবে না। তারা জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হবে না,” বলেন তিনি।

ঘটনার ১৩ দিন পরও ট্রমায় শিশুটির মা

শিশুটির বাবা জানান, ঘটনার ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও তার স্ত্রী এখনো ভয়াবহ মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছেন। তিনি বলেন, মেয়ের মৃত্যুর শোক ও নির্মম ঘটনার স্মৃতি তাকে স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।

“আমার স্ত্রী কোথায় যায়, কী বলে, সে নিজেই জানে না। তাকে প্রতিনিয়ত দেখভাল করতে হচ্ছে। সে আদৌ সুস্থ হবে কি না, আল্লাহই ভালো জানেন,” বলেন তিনি।

একই সঙ্গে বড় মেয়ের মানসিক অবস্থাও তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে বলে জানান এই বাবা। পরিবারের প্রতিটি সদস্য এখন গভীর মানসিক আঘাতের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

‘পাঁচ বছরের শিশুও এখন ধর্ষণ শব্দ শিখে গেছে’

নিজের পরিবারের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে দেশের অন্যান্য শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুক্রবার তার বাড়িতে পাঁচ বছর বয়সী একটি মেয়ে এসেছিল। সেই শিশুটি ইতোমধ্যে ‘ধর্ষণ’ শব্দটি শিখে গেছে। অথচ এই বয়সে তার এমন শব্দের অর্থ জানার কথা নয়।

তিনি বলেন, “সেই শিশুটি এখন একা টয়লেটেও যেতে পারে না। মায়ের আঁচল ছাড়া এক পা-ও নড়ে না। এটাই আজকের বাংলাদেশের শিশুদের মনের অবস্থা।”

তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনাগুলো শিশুদের মনোজগতে ভয় ও অনিরাপত্তার গভীর ছাপ ফেলছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি

বক্তব্যে মেয়ের হত্যাকারীর দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন তিনি। তার মতে, শুধু শাস্তি নিশ্চিত করলেই হবে না, এমন নজির তৈরি করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ শিশুদের ওপর এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করার সাহস না পায়।

‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান, আইনজীবী রাশনা ইমামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম।

পল্লবীর আলোচিত সেই হত্যাকাণ্ড

গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে আট বছর বয়সী শিশুটির খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শিশুটি ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

ঘটনার পর অভিযুক্ত সোহেল বাসার শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। তবে ওই বাসা থেকেই তার স্ত্রীকে আটক করে পুলিশ। পরে একই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ঘটনায় শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

রায় ঘোষণার অপেক্ষা

আলোচিত এই মামলায় বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত।

আদালত আগামী ৭ জুন রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করেছেন। ফলে এখন পুরো দেশ তাকিয়ে আছে এই মামলার রায়ের দিকে।

*নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালার বিধান অনুযায়ী, শিশুটির পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। একই কারণে তার বাবার নামও প্রকাশ করা হয়নি।

এই শাখার আরও খবর

ভারতে প্রথমবার প্রকাশ্যে সমাবেশ করল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ভারতের বিভিন্ন জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বড়…

ভারতে অবৈধভাবে থাকা বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনে দ্রুত নাগরিকত্ব যাচাই চায় দিল্লি

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বাংলাদেশিসহ সব বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে দেশটির প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে ভারত সরকার। একই সঙ্গে এসব…

গাইবান্ধার রামমূর্তি নির্মাণ ঘিরে উত্তেজনা: কারা এবং কেন দিচ্ছে ভাঙার হুমকি?

মেলবোর্ন, ৬ জুন- গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কমপ্লেক্সে নির্মাণাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রামমূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয়…

এভারেস্ট জয়ের রহস্য: ১০০ বছর পরও অজানা ম্যালোরি-আরভিনের শেষ পরিণতি

মেলবোর্ন, ৬ জুন- বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টকে ঘিরে অসংখ্য ইতিহাস, অর্জন ও ট্র্যাজেডির গল্প রয়েছে। তবে এসব কাহিনির মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী…

ইরানের রাডার স্থাপনায় মার্কিন হামলার দাবি, নতুন করে উত্তেজনা

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত উপকূলীয় নজরদারি রাডার স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। শুক্রবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়,…

জনতার জবানবন্দি: ইউনূস সরকারের  ১৮ মাসের দুঃশাসনে জাতি যা হারিয়েছিল

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত—৫৪৭ দিন। ইউনূস সরকার এই ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে দুঃশাসন চালিয়েছিল। “সংস্কার” এর নামে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au