তীব্র বিক্ষোভের মুখে বলিভিয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা
মেলবোর্ন, ২১ জুন- টানা ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে লাতিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন…
মেলবোর্ন, ১৪ ফেব্রুয়ারি- জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ছিল নাজুক অবস্থায়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো একাধিক সংকটের মধ্যে দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দেড় বছর পর ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন, অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে না পড়লেও কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরাতে পারেনি সরকার।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর যে অর্থনৈতিক দুর্দশা তৈরি হয়েছিল, তা সামাল দেওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর ভাষ্য, সরকার প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে সক্ষম হলেও অর্থনীতিতে গতি আনতে পারেনি।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তা নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, নতুন টাকা ছাপানো বন্ধ এবং ঋণের সুদের হার বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে দেড় বছর পরও মূল্যস্ফীতি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা এখনো উচ্চমাত্রার মধ্যে পড়ে বলে মত অর্থনীতিবিদদের।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি চালিয়েও মূল্যস্ফীতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবিরের মতে, অন্য অনেক দেশ যেখানে দ্রুত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম একাধিক দফায় বেড়েছে। বাজারে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এখন ২১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি বলছে, প্রকৃত হার ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশের কাছাকাছি। বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। দেশীয় উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে এগোচ্ছেন না, আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতায় বিদেশি বিনিয়োগও আসেনি। রিজওয়ান রহমানের অভিযোগ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা হলেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। তাঁর মতে, জনগণের অগ্রাধিকার না দিয়ে সরকার নিজেদের অগ্রাধিকারকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বিভিন্ন সভা–সেমিনারে উচ্চ সুদের হারকে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, বরং বেকারত্ব বেড়েছে।
ব্যাংক খাতেও সংকট কাটেনি। রিজওয়ান রহমান বলেন, কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ৩৩ শতাংশের বেশি। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপ না থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক আইন পাস করা যায়নি, যদিও অপ্রয়োজনীয় অনেক আইন পাস হয়েছে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জীবনমানে।
তবে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে, যা মূলত প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফল।
সব মিলিয়ে অর্থনীতির বড় সংকট এড়ানো গেলেও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au