মেলবোর্ন, ২১ জুন- টানা ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে লাতিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ। সরকারবিরোধী আন্দোলন ও দেশজুড়ে অচলাবস্থা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ বলেন, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর সরকার জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। তিনি দাবি করেন, দেশের স্বাভাবিক অর্থনীতি ও জনজীবন ফিরিয়ে আনতে এখন কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
গত কয়েক মাস ধরে বলিভিয়া ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলায় নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করে সরকার। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট বলে পরিচিত এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় দেশটির সবচেয়ে বড় শ্রমিক সংগঠন ‘বলিভিয়ান ওয়ার্কার্স সেন্ট্রাল (সিওবি)’।
গত মে মাসের শুরুতে সংগঠনটির নেতৃত্বে দেশজুড়ে ধর্মঘট, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ শুরু হয়। আন্দোলনের ফলে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায় এবং পণ্য পরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ অচলাবস্থার পর শুক্রবার সরকার ও সিওবি নেতাদের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ না করার প্রতিশ্রুতি দিলে সিওবি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।
তবে আন্দোলনের সব অংশগ্রহণকারী এই সমঝোতা মেনে নেয়নি। সাবেক সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত চাপারে অঞ্চলের শ্রমিক সংগঠন এবং কোকা চাষিরা চুক্তিকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় এবং এখনো দেশের প্রায় ৫০টি স্থানে সড়ক অবরোধ বহাল রেখেছে।
টানা দেড় মাসের এই আন্দোলনের কারণে রাজধানী লা পাজসহ বিভিন্ন বড় শহরে জ্বালানি, খাদ্য ও জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় গণপরিবহন ব্যাহত হয়েছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীকে রাস্তায় নামার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যারা এখনো অবরোধ বজায় রাখছে কিংবা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাত্র সাত মাস আগে মধ্য-ডানপন্থী নেতা রদ্রিগো পাজ বলিভিয়ার ক্ষমতায় আসেন। তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশটিতে প্রায় দুই দশকের সমাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে। তবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই শ্রমিক, কৃষক, খনি শ্রমিক এবং শিক্ষক সংগঠনগুলো তার অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
প্রেসিডেন্ট পাজের অভিযোগ, চলমান বিক্ষোভের পেছনে মাদকচক্র, উগ্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের সমর্থকদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। যদিও বিরোধী পক্ষ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতাকেই সংকটের মূল কারণ হিসেবে দায়ী করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে বলিভিয়ার রাজনৈতিক সংকট নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করল। এখন সরকারের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতি শান্ত করবে, নাকি আরও সংঘাত উসকে দেবে, সেটিই দেখার বিষয়।