সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী
দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…
মেলবোর্ন, ১৪ ফেব্রুয়ারি- বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন চূড়ান্ত হওয়ার পর বিশ্বমঞ্চে প্রথম যে সরকার বিজয়ী দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানালো, তা হলো ভারতের। দীর্ঘ চারটি নির্বাচনে এই ঐতিহ্য মেনে চলেছে দিল্লি – বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানানো। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। বঙ্গবন্ধু কন্যা ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন দল একটানা চারবার নির্বাচিত হওয়ার পর, এই ভোটে তারা লড়াইয়ের সুযোগই পাননি। এর ফলে ভারতের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের বিরোধী দল বিএনপি এবং তার একক গুরুত্বপূর্ণ নেতা, তারেক রহমানের দিকে।
১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, শুক্রবার সকাল ন’টার কিছু পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সোশ্যাল মিডিয়ায় সরাসরি বার্তা পোস্ট করে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, “এই জয় দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ আপনার নেতৃত্বে আস্থা রেখেছে।” আধাঘন্টা পর একই বার্তা বাংলায়ও প্রকাশ করা হয়, যাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে। এরপর মোদি সরাসরি ফোনও করেন তারেককে।
ভারতের এই আচরণকে কূটনীতিবিদরা ‘ডিপ্লোম্যাটিক ইউ-টার্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অতীতের শীতল সম্পর্ক এবং সৌজন্যসূচক পদক্ষেপেও তারেকের প্রতি কোনো তাৎক্ষণিক সাড়া না দিয়ে ভারত যে আচরণ করত, তার সঙ্গে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী বিএনপি সরকার ভারতের জন্য সবচেয়ে ভালো ‘বাজি’। পাশাপাশি ধারণা করা হচ্ছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ভারতকে কিছু নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি প্রথমবারের মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভারতের ক্ষমতায় আসে। সেই সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন। তখন ভারত-বিরোধী রাজনীতির কারণে মোদী সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়নি। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে মোদীকে একটি প্রীতি উপহার পাঠানো হয়েছিল। সেটি দিল্লিতে পৌঁছলেও কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা সম্ভবত তখন পরামর্শ দিয়েছিল, সরাসরি যোগাযোগ এড়ানো উচিত।
ঢাকার সাবেক হাই কমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী মনে করিয়ে দেন, শেখ হাসিনা তখন এই যোগাযোগে অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। সেই কারণে পর্দার আড়ালে ভারপ্রাপ্ত স্তরে বা থিঙ্ক-ট্যাংক ও অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকদের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে কিছু যোগাযোগ থাকলেও তা প্রকাশ্যে আসেনি। বিএনপির রাশ তখন তারেকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল।
৫ আগস্ট ২০২৪-এ বাংলাদেশে ক্ষমতার নাটকীয় পালাবদলের পর ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ভারতের কাছে বিএনপি স্বাভাবিকভাবে ‘অটোমেটিক চয়েস’ হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। এর ফলে মোদীর অভিনন্দন বার্তা এবং ফোন যোগাযোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিনিয়র গবেষক স্ম্রুতি পট্টনায়ক মনে করেন, ভারতের এই পদক্ষেপের পেছনে বড় কারণ হলো নতুন সরকার বাংলাদেশে হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বজায় রাখবে এবং ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য প্রতিশ্রুতি দেবে। তিনি যোগ করেন, যদিও বিএনপি তাদের ‘ভারত-বিরোধী’ পুরনো রাজনীতি পুরোপুরি ছেড়ে দিচ্ছে না, কিন্তু তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ভাষণগুলোতে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো আক্রমণ নেই। দিল্লি এটাকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
গত দেড় বছরে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা ইস্যু ছিল বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই ইস্যুতে ভারত বারবার সরব হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার মনে করেন, রাজনৈতিক দল যাই ক্ষমতায় আসুক, হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা না নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। তিনি বলেন, “খুন-ধর্ষণ-লুঠপাট চলতেই থাকে। দিন বদলায় না।”
অন্যদিকে, দিল্লির পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, নির্বাচিত সরকারের আগমনকে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছে ভারত। ভারতের লক্ষ্য, বাংলাদেশের নতুন সরকারকে অন্তত মৌলিক মানবিক ও নিরাপত্তামূলক মান বজায় রাখার জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করা।
ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানানোর পেছনে শুধু সৌজন্য নয়, কূটনৈতিক ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থও কাজ করেছে। ভারতের কাছে বিএনপি সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সীমান্ত ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, বাংলাদেশে নতুন সরকার হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা, ভারত-বিরোধী রাজনীতির পরিত্যাগ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য প্রতিশ্রুতি দেবে – এটিই ভারতের মূল উদ্দেশ্য।
সিনিয়র কূটনীতিকরা আরও মন্তব্য করেছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দেবে। একই সঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গের ভোট ও সাম্প্রতিক মানবাধিকার ইস্যুগুলো ভারতের কূটনীতিকের নজরদারিতে থাকবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানানোর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। অতীতের শীতল সম্পর্ক, বিএনপির প্রতিশ্রুতি, এবং বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া – এই সব মিলিয়ে ভারতের পদক্ষেপকে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক এবং কৌশলগত দিক থেকে যৌক্তিক বলা যায়। তবে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সফলতা বাংলাদেশের নতুন সরকারের কার্যক্রমের উপর নির্ভর করবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au