অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের একটি মসজিদের বাইরে গভীর রাতে হট্টোগোল ও সাদা গুঁড়ো পদার্থ পাওয়ার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৮ ফেব্রুয়ারি- অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের একটি মসজিদের বাইরে গভীর রাতে হট্টোগোল ও সাদা গুঁড়ো পদার্থ পাওয়ার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে পদার্থটিকে সন্দেহজনক মনে না হলেও ঘটনাটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর পার্থের নর্থব্রিজ এলাকার উইলিয়াম স্ট্রিটে অবস্থিত পার্থ মসজিদের বাইরে রাত প্রায় ১টার দিকে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে বলে খবর পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে মসজিদের সামনের সিঁড়ির কাছে সাদা রঙের একটি নিষ্ক্রিয় গুঁড়ো পদার্থ ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া পুলিশের স্টেট সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশন ইউনিট, যারা সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থাসহ গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে কাজ করে, তারা বিষয়টি তদন্ত করছে। পুলিশ কমিশনার কল ব্ল্যাঞ্চ বলেন, মসজিদের বাইরে সাদা নিষ্ক্রিয় গুঁড়ো পাওয়া গেছে। এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাখা হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ঘটনাস্থল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় হওয়ায় তদন্ত গুরুত্ব দিয়ে চালানো হচ্ছে। ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। গোলযোগের প্রকৃতি ও কারা এতে জড়িত ছিল সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

প্রাথমিকভাবে পদার্থটিকে সন্দেহজনক মনে না হলেও ঘটনাটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ছবিঃ এবিসি নিউজ
এই ঘটনার একদিন আগেই পার্থের উপকণ্ঠ বিনডুন এলাকার ২০ বছর বয়সী জেসন জোসেফ মাইকেলসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির অভিযোগ আনা হয়। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় এ ধরনের অভিযোগ এই প্রথম। তার বাড়ি থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি পার্থ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে পাঁচটি অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন।
এ ছাড়া এক মাসেরও কম সময় আগে ৩১ বছর বয়সী লিয়াম হলের বিরুদ্ধে পার্থের কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক এলাকায় ইনভেশন ডে সমাবেশে ঘরে তৈরি বোমা নিক্ষেপের অভিযোগে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার মামলা হয়। এই দুটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক মসজিদসংক্রান্ত ঘটনাটি আরও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শনিবার পার্থ মসজিদে অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ারসহ জ্যেষ্ঠ সরকারি নেতারা সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অভিযোগিত সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংহতি জানানো এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করাই ছিল এই সফরের উদ্দেশ্য।
পুলিশ কমিশনার ব্ল্যাঞ্চ জানিয়েছেন, জেসন মাইকেলস কোনো নির্দিষ্ট প্রভাববলয় বা ব্যক্তির মাধ্যমে চরমপন্থায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার বাবা-মা পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন। তদন্তে একটি এনক্রিপ্টেড টেলিগ্রাম গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে অস্ট্রেলিয়া ও বিদেশের কিছু সদস্য শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী মতাদর্শ নিয়ে আলোচনা করতেন। তবে এটি প্রতিষ্ঠিত কোনো সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে এখনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কমিশনার বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো কাঠামোবদ্ধ সংগঠন বা সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের প্রমাণ মেলেনি; বরং একই মতাদর্শে বিশ্বাসী কয়েকজন ব্যক্তি অনলাইনে ঘৃণামূলক বক্তব্য আদান-প্রদান করছিলেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ওই গ্রুপে যারা যুক্ত ছিলেন বা আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, তাদের সঙ্গে পুলিশ যোগাযোগ করতে পারে।
পার্থ মসজিদের ইমাম শেখ শাকিব মোহাম্মদ বলেন, রাজনীতিবিদদের বিভাজনমূলক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তিনি বিশেষভাবে অস্ট্রেলীয় সিনেটর পলিন হ্যানসনের একটি মন্তব্যের সমালোচনা করেন, যেখানে তিনি “ভালো মুসলমান” আদৌ আছে কি না—এমন প্রশ্ন তুলেছিলেন। এই মন্তব্য দেশজুড়ে সমালোচিত হয়েছে।
ইমাম মোহাম্মদ বলেন, তার মসজিদের মুসল্লিদের মধ্যে চিকিৎসক, নার্স, আইনজীবী, শিক্ষক ও ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার সাধারণ অস্ট্রেলীয় নাগরিক রয়েছেন। পুরো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা দায়িত্বশীল আচরণ নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, ইসলামবিদ্বেষ এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে এবং এর ফলে দৃশ্যমান মুসলিম পরিচয়ের মানুষ, বিশেষ করে হিজাব পরা নারীরা, বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইমামস কাউন্সিল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মুসলিম উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, কোনো উপাসনালয়ের বিরুদ্ধে হুমকি শুধু একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর আঘাত নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির ওপরও আঘাত। তারা স্পষ্টভাবে বলেছে, জাতি বা ধর্মের ভিত্তিতে ঘৃণার কোনো স্থান অস্ট্রেলিয়ায় নেই।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ