কঠোর নিরাপত্তা বিধিতে শ্রেণিকক্ষে ফিরল ইউএইর শিক্ষার্থীরা
মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল- আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে কয়েক সপ্তাহ দূরশিক্ষণের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) আবারও শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে লাখো শিক্ষার্থী। সোমবার, ২০ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে স্কুল,…
মেলবোর্ন, ১ মার্চ: অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ লিমিটেড (AFERMB) গতকাল ২৮ ফেব্রুয়ারি “Ethnic and Religious Minorities in Bangladesh: Rights, Realities, and Future Pathways” শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে। জুম প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত এ ভার্চুয়াল সিম্পোজিয়ামে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় শতাধিক গবেষক, মানবাধিকারকর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ ও কমিউনিটি নেতারা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। আলোচনা অনুষ্ঠানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানের সূচনা করেন AFERMB-এর অন্যতম পরিচালক অমল দত্ত। তিনি সংগঠনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং সংখ্যালঘু অধিকার বিষয়ে গবেষণা, অ্যাডভোকেসি ও বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন।
এরপর স্বপন পাল, পরিচালক, AFERMB, Acknowledgement of Country (একনলেজমেন্ট অফ দ্য কান্ট্রি) পাঠের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার এবোরিজিনাল কমিউনিটির (Aboriginal Community) প্রতি সম্মান জানান এবং বিশ্বজুড়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
মূল প্রবন্ধ সেশনে সভাপতিত্ব করেন সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির অধ্যাপক ড. জহর ভৌমিক। এই পর্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক বিনা ডি’কোস্টা।
তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর আলোকে সংখ্যালঘু অধিকার বিশ্লেষণ করেন এবং ‘precarity’ বা অনিশ্চয়তার ধারণা থেকে কীভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা বারবার টার্গেট হয়েছেন ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বিশ্লেষণ করেন, আন্তর্জাতিক আইনে কাকে সংখ্যালঘু বলা হয়? ঔপনিবেশিক শুমারি পদ্ধতি ও সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্ব কীভাবে পরিচয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে? সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান রাষ্ট্র ও সমাজের সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণে কী প্রভাব ফেলেছে?
অধ্যাপক ডি’কোস্টা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত আইন নেই। বিদ্যমান বৈষম্যবিরোধী আইনগুলোর দুর্বল প্রয়োগ এবং লক্ষ্যভিত্তিক সুরক্ষার অভাব সহিংসতা ও প্রান্তিকীকরণের পুনরাবৃত্তির অন্যতম কারণ বলে তিনি মত দেন।
জাতীয় দৈনিক ও অন্যান্য নথিভুক্ত প্রতিবেদনের আলোকে তিনি হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সংঘটিত হামলার ধারাবাহিকতা তুলে ধরেন এবং বলেন, অনেক ঘটনা মূলধারার গণমাধ্যমে স্থান পায় না। শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণকারীরা সক্রিয়ভাবে মতবিনিময় করেন।
সিম্পোজিয়ামের দ্বিতীয় পর্বে ড. স্বপন পাল, ইঞ্জিনিয়ার দিলীপ দত্ত ও ইঞ্জিনিয়ার শর্মিষ্ঠা সাহার নেতৃত্বে একটি প্রাণবন্ত প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই সময় AFERMB-এর বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সদস্য সমীর সরকার সিম্পোজিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার আগে,আলোচনার ধারাবাহিকতা চলমান থাকা অবস্থায় তাঁর আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে সিমপোজিয়ামে উপস্থিত সকল সদস্যকে ধন্যবাদজ্ঞাপন করেন।
এই পর্বে শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (HRCBM)-এর ড. ধীমান দেব চৌধুরী একটি গভীর বিশ্লেষণধর্মী ও ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন, যেখানে তিনি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতা ও প্রেক্ষাপট সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
তিনি ১৯৪৬ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর পুনরাবৃত্ত সহিংসতার ঘটনাগুলোকে একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্যে বিশ্লেষণ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (HRCBM)-এর ড. ধীমান দেব চৌধুরী ১৯৪৬ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত পুনরাবৃত্ত গণহত্যামূলক অপরাধ নিয়ে উপস্থাপনা করেন এবং সমসাময়িক ঘটনাবলিকে একটি বিস্তৃত ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্বের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যাগত ধারাবাহিক পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন— এটি কি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি এর পেছনে পরিকল্পিত নিপীড়নের উপাদান রয়েছে?
তিনি সংখ্যালঘু বিষয়ক গবেষণা আরও জোরদার করা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমন্বিত অ্যাডভোকেসি বৃদ্ধি, কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার ও পরিবার পুনর্মিলনের জন্য সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্যানেলে আরও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ফেলো ড. অনুরাগ চাকমা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. কুশল বরণ চক্রবর্তী।
অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত সংখ্যালঘুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ঐক্য ও ধারাবাহিক আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
ড. কুশল বরণ চক্রবর্তী সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকট, ধর্মান্তরের চাপ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার না হওয়া, সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেট বৈষম্য এবং হিন্দু ধর্মের নেতিবাচক প্রচারণার বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু ইস্যুতে মূলধারার গণমাধ্যমের কভারেজ সীমিত এবং এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও বিশ্বাসযোগ্য মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে ড. চক্রবর্তী গণ-সহিংসতা ও ভয়ভীতির বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে ঢাকার শাহবাগের সৃষ্ট পরিস্থিতি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে পেশাগত পদোন্নতির সাক্ষাৎকার চলাকালে সংঘটিত ভয়াবহ মব সংস্কৃতির ঘটনাও উল্লেখ করেন, যা তাঁর মতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন।
ড. অনুরাগ চাকমা ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতার প্রেক্ষাপট নিয়ে তাঁর গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পালা পরিবর্তনের সময় কিভাবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, সাংবিধানিক সুরক্ষা জোরদার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
আয়োজকদের মতে, এই সিম্পোজিয়াম আন্তর্জাতিক সংলাপ জোরদার, গবেষণা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার ও সুরক্ষার পক্ষে বৈশ্বিক উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
– নিজস্ব প্রতিবেদক, ওটিএন বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au