ইরানের ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগর’ এখন বড় কৌশলগত সংকটে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- ইরানের বহু বছর ধরে গড়ে তোলা ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি বা ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগর’ এখন দেশটির জন্য বড় কৌশলগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর ইরানের এসব গোপন ঘাঁটি এখন নিয়মিত হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান এবং সশস্ত্র ড্রোন ইরানের বিভিন্ন ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ওপর নজরদারি জোরদার করেছে। এসব ঘাঁটি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী লঞ্চার বের হওয়া মাত্র সেগুলোর ওপর দ্রুত হামলা চালানো হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগেই সেগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে নিরাপদ রাখতে পাহাড়ি এলাকা ও মাটির গভীরে বিস্তৃত সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক তৈরি করে সেখানে বিশাল ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। এসব ঘাঁটিকে সাধারণভাবে ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্র নগর বলা হয়। ধারণা করা হয়, এসব স্থাপনায় ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সংরক্ষণ করা হয়।
তবে চলমান যুদ্ধে এই কৌশল এখন উল্টো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। কারণ এসব ঘাঁটির প্রবেশপথ, রাস্তা এবং উপরের স্থাপনা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বাহিনী সহজেই এসব স্থাপনার অবস্থান নির্ধারণ করে সেখানে হামলা চালাতে পারছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দিনে স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে ইরানের কয়েকটি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির প্রবেশপথে ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। ভারী বোমা হামলার কারণে অনেক জায়গায় সুড়ঙ্গের মুখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ভেতরে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চারগুলো বাইরে বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং অনেক অস্ত্র মাটির নিচেই আটকে পড়ছে।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিরাজ নগরীর কাছে থাকা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে কয়েক দফা হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া ইসফাহান, তাবরিজ এবং কেরমানশাহ শহরের আশপাশেও এমন ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত এক সপ্তাহের যুদ্ধে যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি আক্রান্ত হয়েছে তার বেশিরভাগই ছিল মাটির নিচে নির্মিত এসব স্থাপনা।
এসব ঘাঁটির ভেতরে শাহাব-৩, ঘাদর-এইচ, ইমাদ, খেইবার শেকান এবং সেজ্জিলের মতো দূরপাল্লার শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ করা হয় বলে ধারণা করা হয়। এগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে আঘাত হানতে সক্ষম।
গত মার্চ মাসে ইরান তাদের সবচেয়ে বড় ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিল। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, দীর্ঘ জানালাবিহীন করিডোরের ভেতর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী বহু ট্রাক সারিবদ্ধভাবে রাখা আছে এবং উচ্চপদস্থ ইরানি সামরিক কর্মকর্তারা সেগুলো পরিদর্শন করছেন। তবে ওই ঘাঁটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান পাঁচ শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি এবং অন্যান্য স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সংখ্যা কমে গেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএনএ করপোরেশনের বিশ্লেষক ডেকার ইভেলেথ। তার মতে, ইরান এখন ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কৌশল থেকে কিছুটা সরে আসার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারাও দাবি করেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক শীর্ষ মার্কিন কমান্ডার ব্র্যাড কুপার বলেছেন, ইরানের হাতে থাকা অবশিষ্ট ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলোও শনাক্ত করে ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, গত চার দিনের মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের হার প্রায় ৮৬ শতাংশ কমে গেছে। তাদের মতে, ধারাবাহিক হামলার ফলে ইরানের অনেক লঞ্চার এবং অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল অস্ত্রগুলোকে শত্রুর হামলা থেকে আড়াল করা। কিন্তু স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার কারণে এখন এসব স্থাপনার অবস্থান গোপন রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লায়ার বলেন, আগে যেসব ক্ষেপণাস্ত্র সহজে সরানো যেত এবং যেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন ছিল, এখন সেগুলো স্থানান্তর করা কঠিন হয়ে গেছে। ফলে সেগুলোর ওপর হামলা চালানোও সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার মতে, এই পরিস্থিতি ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নগর তৈরির কৌশলের একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে এবং চলমান যুদ্ধে সেটিই এখন দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।