নেপালে সাধারণ নির্বাচন আজ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১২ মার্চ- নেপালে সদ্য অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের ভোট গণনা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পথে রয়েছে। তবে নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্যের মধ্যেই দলটির ভেতরে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নিয়ে দ্বন্দ্ব ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি এবং কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহর মধ্যে একটি সাত দফা চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তি অনুযায়ী বালেন্দ্র শাহকেই দলটির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল। চুক্তির চতুর্থ ধারায় বলা হয়েছিল, দলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন রবি লামিছানে এবং সংসদীয় দলের নেতা ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হবেন বালেন্দ্র শাহ।
কিন্তু নির্বাচনে বড় জয়ের পর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কিছু অস্পষ্ট বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দলটির সভাপতি রবি লামিছানে এবং সহসভাপতি ডি পি আর্যালের মন্তব্যে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে যে শেষ পর্যন্ত কে প্রধানমন্ত্রী হবেন।
কাঠমান্ডু-৯ আসন থেকে নির্বাচিত সহসভাপতি ডি পি আর্যালের কাছে চুক্তির বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আবার দেখে নিতে হবে। তার ভাষায়, চুক্তির সব খুঁটিনাটি তার মনে নেই। যদি এমন কোনো ধারা থেকে থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই অনুসরণ করা হবে।
একই বিষয়ে দলের সভাপতি রবি লামিছানেকেও প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক মহলে জল্পনা আরও বেড়েছে।
রবি লামিছানে চিতওয়ান-২ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন। তবে সমবায় জালিয়াতি, অপরাধ ও অর্থ পাচারসংক্রান্ত একাধিক মামলা তার বিরুদ্ধে বিচারাধীন রয়েছে। এসব আইনি জটিলতার কারণে আপাতত তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়া কঠিন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তবে দলটির কয়েকজন নেতা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বালেন্দ্র শাহর সঙ্গে কোনো ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে না। রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির নেতা শিশির খানাল বলেন, নির্বাচনের আগে বালেন্দ্র শাহকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করেই দল ভোট চেয়েছিল। তাই এখন সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, বালেন্দ্র শাহই শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হবেন।
গত ২৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন বালেন্দ্র শাহ। এরপর জনকপুরে এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, মধেশি জনগোষ্ঠীর একজন সন্তানই দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। সেই বক্তব্যও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
৫ মার্চ অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল করেছে। সরাসরি নির্বাচিত ১৬৫টি আসনের মধ্যে ১২৫টিতে জয় পেয়েছে দলটি। পাশাপাশি সমানুপাতিক ভোটের প্রায় ৫০ শতাংশও তাদের ঝুলিতে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এতে করে দেশটির রাজনীতিতে দলটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক চন্দ্রদেব ভট্ট মনে করেন, নির্বাচনে এই সাফল্যের পেছনে বালেন্দ্র শাহর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বড় ভূমিকা রেখেছে। তার মতে, নির্বাচনের আগে যেভাবে তাকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল, পরে তাকে সেই পদে না বসালে তা ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দলীয় গঠনতন্ত্রের কিছু বিধান বালেন্দ্র শাহর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে জটিলতা তৈরি করতে পারে। রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির সংবিধান অনুযায়ী, সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হতে হয় প্রত্যক্ষ ও সমানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে ভোটাভুটির মাধ্যমে। বালেন্দ্র শাহ যেহেতু সরাসরি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেননি, তাই এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন কিছুটা জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে দলটির নেতা শিশির খানাল দাবি করেছেন, অতীতেও দলীয় বিধিবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচন করা হয়েছে। তাই বালেন্দ্র শাহর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধা বড় সমস্যা হবে না বলেই তিনি মনে করেন।
এদিকে নেপালের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী ১৯ মার্চের মধ্যে নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলের কাছে জমা দেওয়া হবে। এরপর সংবিধান অনুযায়ী নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হবে।
নির্বাচনের বড় জয়ের পরও রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির ভেতরে প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন শেষ পর্যন্ত দলটি নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুতি অনুসরণ করবে কি না, সেটিই হয়ে উঠেছে প্রধান প্রশ্ন।
সূত্রঃ কাঠমুন্ডু পোস্ট